শুক্রবার, ২১ জুন ,২০১৯

Bangla Version
  
SHARE

বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৯, ০৫:২৩:১০

রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কার: সুজন

রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কার: সুজন

ঢাকা : জনকল্যাণমুখী রাজনীতি ফিরিয়ে আনার জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর নেতৃবৃন্দ।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘সুজন’ আয়োজিত ‘কোন দলের কেমন ইশহেতার’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। অনুষ্ঠানে সুজন-এর পক্ষ থেকে কিছু সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সুজন সভাপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুজন নির্বাহী সদস্য সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, প্রকৌশলী মুসবাহ আলীম, সুজন-এর জাতীয় কমিটির সদস্য ড. সিআর আবরার, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার রুহিন ফারহানা, আব্দুল্লাহ আল ক্বাফি রতন প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, গত বছর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ে আমাদের তরুণরা ‘রাষ্ট্র মেরামতের’ দাবি তুলেছিল। সাম্প্রতিক নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, রাষ্ট্র মেরামতের বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনীয় আইনকানুন-নীতি কাঠামো-মূল্যবোধ, পদ্ধতি-প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠান একটি রাষ্ট্রের ‘গভর্নেন্স’ বা শাসন ব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ। রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে শাসন কাঠামোর এসব অঙ্গ সক্রিয়তা অর্জন করে। তবে ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার হলে শাসন কাঠামো কার্যকর হয়, যা রাষ্ট্রে সুশাসন কায়েম করে। আর ক্ষমতার লাগামহীন ব্যবহার হলে রাষ্ট্রে ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা নজরদারিত্বের কাঠামো ভেঙে গেলে যা ঘটে- এসব অঙ্গগুলো কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে, রাষ্ট্রে অপশাসন কায়েম হয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার ঘটে। তাই রাষ্ট্র মেরামতের সূচনা হতে হবে শাসন কাঠামোকে কার্যকর করার মাধ্যমে, যার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় কতগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কার।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি, মানব সেবার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে রাজনীতি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই দেশে অর্জিত হতে হবে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সুশাসন। আর এজন্য প্রয়োজন সুস্থ ধারার তথা আদর্শভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতি। এককালে এদেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চা হলেও, বর্তমানে অনেকাংশেই তা অপরাজনীতি ও দুবৃর্ত্তায়নের শিকার। কিন্তু জনকল্যাণমুখী রাজনীতি ফিরিয়ে আনার জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই, যার জন্যও প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার।

এরপর দিলীপ কুমার সরকার অনুষ্ঠানে সুজনের সংস্কার প্রস্তাবসমূহ তুলে ধরেন। প্রস্তাবগুলো হলো:

১। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন।

২। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সম্মতির শাসন তথা গণতান্ত্রিক শাসনের সূচনা হয়। তাই এ নির্বাচন হওয়া দরকার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনটি ছিলো একতরফা ও বিতর্কিত। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কয়েকটি স্থানীয় সরকার ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে ব্যাপক কারচুপি ও মানুষের ভোটাধিকার অধিকার হরণের। তাই গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের লক্ষ্যে আমাদের নির্বাচনকালীন সরকারকে নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি। আর নির্বাচন ব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত ও পরিশুদ্ধ করতে এবং নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আজ প্রয়োজন এর কতগুলো সংস্কার, যার জন্য আবশ্যক হবে আইন সংশোধন ও নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন।

৩। জাতীয় সংসদকে একটি স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা দরকার, যাতে এটি রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণসহ নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে।

৪। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন বিচার বিভাগের সত্যিকারের পৃথকীকরণ এবং আইনের শাসন কায়েম করা। এর জন্য প্রয়োজন হবে ধ্বংস প্রায় ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে কার্যকর করা। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ ও অপসারণের জন্য একটি আইন প্রণয়ন করা।

৫। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার জন্য প্রয়োজন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী আইন প্রণয়ন এবং তা যথাযথভাবে অনুসরণ করে স্বচ্ছতার সাথে সঠিক ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ প্রদান। সকল নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কমিশনকে প্রয়োজনীয় আর্থিক এবং জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদান ও আইনি কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা।

৬। সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্যে প্রয়োজন একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা আবশ্যক। সংস্কারের ক্ষেত্রগুলো হতে পারে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য সৃষ্টি, সংসদে এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণ ও সরাসরি নির্বাচন, ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার, আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, গণভোটের বিধান পুনঃপ্রবর্তন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য একটি বড় আকারের ‘ইলেক্টরাল কলেজ’ গঠন, সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, ‘টার্ম লিমিটে’র বিধান প্রবর্তন ইত্যাদি।

৭। গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ এবং দায়বদ্ধ রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্যে প্রয়োজন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী মনোনয়ন ও অর্থায়নে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং পরিবারতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবসান ঘটানো। রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে পরিবারতন্ত্র, উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষ ও সহিংসতা পরিহার করার অঙ্গীকার নিশ্চিত করা।

৮। স্বাধীন বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রয়োজন সঠিক ব্যক্তিদের নিয়োগ ও যথাযথ আইনি সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ কোনোক্রমেই যাতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও দলীয়করণে শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা।

৯। দুর্নীতি বিরোধী সর্বাত্মক অভিযান।

১০। যথাযথ প্রশাসনিক সংস্কারে প্রয়োজন একটি যুগোপযোগী জনপ্রশাসন আইন প্রণয়ন এবং মান্ধাতার আমলের পুলিশ আইনের সংস্কার করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিতকরণসহ নিয়োগ বাণিজ্যের অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানসমূহকে সত্যিকারের সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।

১১। বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার।

১২। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা।

১৩। একটি কার্যকর ও শক্তিশালী নাগরিক সমাজই রাষ্ট্রের সকল সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারিত্ব করার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে কার্যকর ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে পারে। তাই কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে, নাগরিক সমাজের কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

১৪। মানবাধিকার সংরক্ষণে প্রয়োজন মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সকল নিবর্তনমূলক ধারা সংশোধন করা এবং গুম, অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অবসানের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতির অবসান করা।

১৫। রাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান আয় ও সুযোগের বৈষম্য নিরসনে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি প্রণয়ন করা আবশ্যক। রাষ্ট্রীয় সম্পদে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নায্য হিস্যা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজন তাদেরকে ভর্তুকিসহ ঋণ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা প্রদান করা।

১৬। জীব-বৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জলবায়ূ পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে মুক্তির লক্ষ্যে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।

১৭। আর্থিক খাতে লুটপাট প্রতিরোধসহ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজন আইনি সংস্কার এবং ঋণখেলাপিসহ লুটপাটকারীদের পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তে বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।

১৮। জনসংখ্যাজনিত সুযোগ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’কে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে প্রয়োজন তরুণদের জন্য আরও বিনিয়োগ করা। তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থসেবা, নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সুযোগ সৃষ্টি করা।

অনুষ্ঠানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, উদার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আমরা ক্রমেই সঙ্কুচিত করে ফেলছি। এরফলে সংক্রামকের মতো উগ্রবাদের উত্থান ঘটতে পারে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে করায়ত্ব করে ফেলা হচ্ছে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের শাসনব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। তাই শাসনব্যবস্থা ঠিক করা তথা রাষ্ট্রকে মেরামতের জন্য আমাদের রাজনীতিবিদ রাজনৈতিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে সদিচ্ছা প্রদর্শন করবেন, যাতে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ ঘটানো যায়।

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?