বুধবার, ২৪ অক্টোবর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

রবিবার, ২৭ মে, ২০১৮, ০১:২৮:৫৫

বিয়ের রাতেই মুবিনাকে ধর্ষণ করে বিএসএফ

বিয়ের রাতেই মুবিনাকে ধর্ষণ করে বিএসএফ

ঢাকা: ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা অনন্তনাগের আর পাঁচটি গ্রামের মতোই একটি গ্রাম মহিপুরা। এই গ্রামেরই বাসিন্দা মুবিনা গণির জীবনে ২৮ বছর আগে নেমে এসেছিল অন্ধকার। ১৯৯০ সালের ১৮ মে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিসএসএফ) নৃশংসতায় তার বিয়ের অনুষ্ঠান পরিণত হয়েছিল হত্যাযজ্ঞে। বর্তমানে তিন সন্তানের মা মুবিনার বয়স তখন ছিল ২৫ বছর। দিনটি ‍ছিল তার বিয়ের দিন।

হাতে মেহেদি লাগিয়ে গোলাপী শাড়িতে পেশায় কৃষক আবদুর রশিদ মালিকের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছিলেন মুবিনা। চোখে ছিল নতুন স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ছিনিয়ে নেয় বিএসএফ সদস্যরা। ভারত সরকারের নিঃশর্ত ক্ষমতার আওতায় তখন যা ইচ্ছা, তা-ই করছিল এই বাহিনীটি। নিয়মিত কারফিউ আর যেখানে সেখানে চেকপয়েন্ট বসানো তখন রীতিতে পরিণত হয়েছিল।

বর্তমানে পঞ্চাশ বছর বয়সী রশিদ মালিক বলেন, ‘আমরা স্থানীয় সরকারের কাছ থেকে কারফিউ পাস নিয়েছিলাম।’ স্থানীয় রীতি অনুসারে বিয়ের জন্য ওইদিন রাত আটটায় বাসে চড়ে মহিপুরার উদ্দেশ্যে বন্ধু ও আত্মীয়দের নিয়ে রওনা দেন তিনি।

কয়েক ঘণ্টা ধরে চললো বিয়ের অনুষ্ঠান। তারপর খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নববধূকে নিয়ে মহিপুরা ছেড়ে একই বাসে নিজের গ্রাম লিজের জাওয়ালগামে রওনা দেন। প্রায় তিন কিলোমিটার যাত্রাপথের মাঝখানে বিএসএফের একটি টহলদল তাদের বাসটি থামায়। মালিক বলেন, ‘প্রথমে তারা চালকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং লাইট বন্ধ করার জন্য বলে।’ সেদিনের কথা স্মরণ করে তিনি আরো বলেন, ‘আমার ভাই তাদের কারফিউ পাস দেখাতে যাচ্ছিল, এমন সময় তারা বাসের চালককে গুলি করে।’

এরপর যা ঘটেছিল, সেটাকে শুধু বলা যায়, ‘সম্মিলিত সাজা’। কাশ্মীরে যেকোনো অপরাধের জন্য আগে থেকেই বিএসএফকে নিঃশর্ত ক্ষমার আওতায় রাখা হয়েছিল। মুবিনা বলেন, ‘মেশিন গান দিয়ে বিএসএফ সদস্যরা বাসটিতে এলোপাথাড়ি গুলি করতে থাকে। আমরা সবাই মাথা নিচু করে রেখেছিলাম, কিন্তু বুলেটবিদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা পেলাম না।’

বাসের ১০ জন যাত্রী গুলিবিদ্ধ হয়, যার মধ্যে ছিলেন নববধূ মুবিনা ও তার স্বামী। তাদের শরীরে সাতটি গুলি লেগেছিল। এখনো তাদের গায়ে আছে সেই ক্ষত। ঘটনাস্থলেই নিহত হন মালিকের চাচাতো ভাই আসাদুল্লাহ মালিক। পাঁচজন গুরুতর আহত হন। তবুও নৃশংসতা থামেনি।

ওই অবস্থায়ই মুবিনা ও তার গর্ভবতী খালাকে নিয়ে যাওয়া হয় বিএসএফের ক্যাম্পে। সেখানে নিয়ে গণধর্ষণ করা হয় তাদের। কমপক্ষে চারজন বিএসএফ সদস্য নববধূকে ধর্ষণ করে। মুবিনা বলেন, ‘ওই রাতে আমার শরীর ও মনের ওপর যে নির্যাতন করা হয়, তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। নৃশংসতার সেই ক্ষত সারিয়ে উঠতে এক মাস হাসপাতালে থাকতে হয় আমাকে।’

বাসের বাকি যাত্রীরা যেন রক্তের পুকুরে শুয়ে ছিল, চিৎকার করছিল। তবে নববধূর দুঃস্বপ্ন সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। তাকে আরো ৪৮ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এই ভয়াবহতা পুরো কাশ্মীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু কারো কিছু বলার ছিল না। ভয়ে এরপর থেকে সবাই দিনের বেলায় বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করতো।


 

মুবিনা গণি ও তার স্বামী রশিদ মালিক

ওই ঘটনায় স্থানীয় থানায় মামলা দেয়া হয়েছিল। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ধর্ষণের ঘটনা সেদিন ঘটেছিল। তবে মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি। রশিদ মালিক হতাশার সুরে বলেন, ‘আমাদের বিবৃতি রেকর্ড করা হয়েছিল কয়েকবার, তবে কাউকেই বিচারের আওতায় আনা হয়নি।’

নিঃশর্ত ক্ষমার আওতায় থাকায় ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরে যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনায়ও পাড় পেয়ে যায় ভারতীয় বাহিনী। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিও) মতে, নব্বইয়ের দশক থেকে কাশ্মীরে ধর্ষণকে যুদ্ধের একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে ভারতীয় বাহিনী। ওই সময়েই ভারত সরকার কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীদের দমনে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে।

কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর ব্যাপক হারে ধর্ষণের প্রচুর প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও হাতেগোনা কয়েকটির তদন্ত হয়েছে মাত্র। এর মধ্যে কোনোটিরই ফৌজদারি মামলা হয়নি। ২০০৯ সালে সোপিয়ান জেলায় ১৭ বছর বয়সী আয়িশা জান ও তার ভাবি নীলুফার জানকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। হাসপাতালের নথিতেও বলা হয়, তাদের ধর্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু তা অস্বীকার করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য, পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল তারা দুজন। অথচ সেখানে পানির গভীরতা ছিল মাত্র কয়েক ইঞ্চি।

এ বিষয়ে স্থানীয় গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ইরফান মেহরাজ বলেন, ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌন সহিংসতার ঘটনা তদন্তে অনিচ্ছা প্রমাণ করে, ভারতের আইনব্যবস্থায় কাশ্মীরের মানুষ ন্যায়বিচারের বাইরে। এটা ভারত থেকে তাদের স্বাধীন হওয়ার দাবিকে যৌক্তিক প্রমাণ করে।’

ধর্ষণের মতো ঘটনায় মানসিক চিকিৎসার জন্য যে ধরনের ব্যবস্থা থাকা দরকার তা-ও নেই কাশ্মীরে। রাজ্য কর্মকর্তারাও কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়ে ভুক্তভোগীদের থামিয়ে রাখার চেষ্টা করে। তার ওপর ধর্ষণের শিকার নারীদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।

এই বিভাগের আরও খবর

আজকের প্রশ্ন

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বিএনপির নেতারা মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি করছে। আপনিও কি তাই মনে করেন?