মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

বুধবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৮, ০৫:৩৫:০৭

মোবাইল অফারের ১ টাকার ফাঁদ : রাজধানীতেই গ্রাহকদের গচ্চা দৈনিক ২৫ লাখ

মোবাইল অফারের ১ টাকার ফাঁদ : রাজধানীতেই গ্রাহকদের গচ্চা দৈনিক ২৫ লাখ

ঢাকা : দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর বিভিন্ন অফারের প্যাকেজমূল্য ৯ টাকা, ১৯ টাকা, ২৯ টাকা, ৩৯ টাকা, ৭৯টাকা, ১৭৯ টাকা এভাবে বিভিন্ন দামের হয়। আবার কখনও ১১ টাকা, ২১ টাকা, ৩১ টাকা এভাবে ১৭১ টাকাও হয়। অর্থ্যাৎ অপারেটরগুলোর বিশেষ অফারের প্যাকেজগুলোর মূল্য দশক সংখ্যার চেয়ে ১ টাকা বেশি অথবা ১ টাকা কম। কখনও ভেবেছেন অফারগুলোর মূল্য এমনটা কেন হয়?

প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা এখন প্রায় ১৫ কোটি। বিশাল এই গ্রাহক শ্রেণীর জন্য নির্দিষ্ট কলচার্জ অথবা নির্দিষ্ট টকটাইম, এসএমএস এবং ইন্টারনেট ডাটার অফার দেয় মোবাইল অপারেটরগুলো।

কিন্তু এসব অফারের প্যাকেজের মূল্য এমনভাবে সাজানো যার মূল্য গ্রাহক পরিশোধ করলে এজেন্ট থেকে ১ টাকা ফেরত পাবেন গ্রাহকেরা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান সময়ে এই ১ টাকা আর ফেরত পাওয়া যায় না এজেন্টগুলো থেকে। আর এতে শুধু রাজধানীতেই গ্রাহকদের পকেট থেকে দৈনিক গচ্ছা যাচ্ছে অতিরিক্ত ২৫ লাখ টাকা।

এছাড়া ৩০ টাকার নিচে যেকোনো অংকের রিচার্জে রিচার্জ এজেন্টগুলোকে অতিরিক্ত দিতে হয় ১ টাকা। যদি ৩০ টাকাও মূল্য পরিশোধ করেন তাহলে মোবাইলে ব্যালেন্স পাবেন ২৯ টাকা। আর ৯ টাকা বা ১৪ টাকা সমমূল্যের অফার স্ক্র্যাচকার্ডে মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ দিলে গ্রাহকের কাছে কার্ডই বিক্রি করবে না মোবাইল রিচার্জ এজেন্ট।

বাস্তব চিত্র

মোহাম্মদ দিদার রাজধানীর একটি বেসরকারি কলেজের ছাত্র। ৯ টাকায় ৩২ এমবি ইন্টারনেটের অফার নিতে মিরপুরের একটি রিচার্জ পয়েন্টে যান তিনি। সেখানে ৯ টাকা দিয়ে এই এমবি কার্ড চাইলে দোকানদার বলেন, ‘কার্ড নেই’।

কিছুক্ষণ পর একই দোকানে আবারও ৯ টাকার একই এমবি কার্ড কিনতে যান মোহাম্মদ দিদার। এসময় ১০ টাকার একটি নোট দোকানদারের দিকে বাড়িয়ে দেন তিনি। এবার পাওয়া যায় এমবি কার্ড। কার্ড নিয়ে ‘১ টাকা’ ফেরত চাইলে দোকানদার বলেন, ‘এটার দাম ১০ টাকা’।

১ টাকার হারানোর ক্ষোভ নিয়ে মোহাম্মদ দিদার  বলেন, ‘বিষয়টা মাত্র ১ টাকার বলে হয়তো আমরা কেউ তর্কে জড়াই না। কিন্তু ১ টাকা হোক আর ১ কোটি টাকা হোক। আমার টাকা তো! এভাবে তো আমার টাকা আরেকজন নিয়ে যেতে পারে না। আর চায়ের দোকান হলে তো তাও ৫৫ পয়সার চকলেট ধরিয়ে দেয়। মোবাইল রিচার্জ এজেন্টগুলো তো তাও দেয় না’।

রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নূরে আলম। পান্থপথের একটি মোবাইল রিচার্জ পয়েন্টে নিজের নম্বর দিয়ে ৩০ টাকা লোড করতে দিয়ে ক্লাসে চলে যান তিনি। ক্লাসে গিয়ে দেখেন মোবাইলে ব্যালেন্স এসেছে ২৯ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন মোবাইল রিচার্জকারী এজেন্টকে। তিনি বলেন, ‘৩০ টাকা পর্যন্ত যেকোনো রিচার্জে ১টাকা কম পাওয়া যায়, জানেন না?’

গ্রাহকদের গচ্চা রোজ ২৫ লাখ

দেশের টেলিকম খাত সংশ্লিষ্টদের থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, শুধু রাজধানীতেই গড়ে ৫০ হাজার মোবাইল রিচার্জ পয়েন্ট আছে মোবাইল অপারেটরগুলোর। রাজধানীর মিরপুর, মতিঝিল, গুলশান, উত্তরা, কারওয়ান বাজার, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকজন মোবাইল রিচার্জ এজেন্টের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এসব রিচার্জ পয়েন্ট থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, সর্বনিম্ন ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০টি লেনদেন হয় ৯, ১৯, ২৯, ৩৯ টাকা বা এ ধরণের অংকে; যার কোনো ক্ষেত্রেই ১টাকা ফেরত দেয় না এজেন্টরা।

সেই হিসেবে ৫০ হাজার রিচার্জ পয়েন্ট থেকে যদি রোজ সর্বনিম্ন ৫০টি লেনদেনও বিবেচনা করা হয় তাহলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় কমপক্ষে ২৫ লাখ টাকা (৫০,০০০*৫০=২৫,০০,০০০ টাকা)। পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেবে এই অর্থের পরিমাণ আরও বেশি হবে বলেই সহজে অনুমান করা যায়।

শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের এক তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে মোবাইল রিচার্জ পয়েন্টের সংখ্যা সাড়ে আট লাখেরও বেশি। সেই হিসেবে গড়ে প্রতিটি রিচার্জ পয়েন্টে ১ টাকা ফেরত না দেওয়া অথবা ১ টাকা বেশি রাখা লেনদনের সংখ্যা যদি গড়ে ২০টিও ধরে নেওয়া হয় তাহলেও প্রতিদিন গ্রাহকদের খরচ করতে হয় এক কোটি ৭০ লাখ!

বিহাইন্ড দ্য সিন

মোবাইল অপারেটরগুলোর অফারের মুল্য দশক সংখ্যা থেকে ১ টাকা বেশি বা কম কেন তা জানার চেষ্টা করে একুশে টিভি অনলাইন। অফারের এমন মূল্যের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রধান যে কারণটি পাওয়া যায় তা হলো, অপারেটরগুলোর থেকে এজেন্টদের খুবই কম কমিশন পাওয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিটি মোবাইল অপারেটর প্রতি এক হাজার টাকা রিচার্জে ২৭ টাকা ৫০ পয়সা কমিশন দেয় এজেন্টদের। প্রথম দিকে এই কমিশন আরও কম ছিলো। কয়েক দফায় কমিশনের মূল্য গিয়ে ঠেকে ২৭ টাকা ৫০ পয়সায়। তবুও কমিশনের এই মূল্য নিয়ে দীর্ঘদিন অভিযোগ ও অসন্তোষ জানিয়ে আসছেন এজেন্টরা।

কিন্তু এজেন্টদের কমিশন না বাড়িয়ে তাদেরকে একরকম ‘খুশি’ করতেই নিজেদের প্যাকেজগুলো এভাবে সাজায় অপারেটরগুলো।

এ বিষয়ে বিভিন্ন রিচার্জ পয়েন্টের এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মোহাম্মদ সুমন নামের এক রিচার্জ এজেন্ট জানান, ‘মোবাইল ওয়ালারা (অপারেটর) আমাদেরকে হাজারে সাড়ে ২৭ টাকা দেয়। যেদিন খুব বেশি লেনদেন করি সেদিন হয়তো ১৫ হাজার টাকা লেনদেন করি। তাহলে কমিশন পাই ৪০০ টাকার (৪১২.৫০ টাকা) মতো। এই টাকা দিয়ে কি চলে ভাই বলেন? আর সবসময় তো এত লেনদেন হয় না। তার মধ্যে যদি কোন নম্বরে ভুলে কোনো টাকা চলে যায় তাহলে তো পুরাই লস।’

বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘মোবাইল অপারেটরগুলোর এসব অফার গ্রাহকদের সুবিধার জন্য না। অপারেটরগুলো এজেন্ট বা রিটেলারদের যে কম কমিশন দেয় সেটিরই একটা ভর্তুকি দেওয়ার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে এই অফার সাজানো হয়। এজেন্টদেরকে কমিশন নিজেরা না দিয়ে গ্রাহকদের পকেট কেটে এই অর্থ আদায় করে গ্রাহকদের কাছ থেকেই কৌশলে সরাসরি এজেন্টদেরকে দেওয়াচ্ছে অপারেটরগুলো।’

মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান বাজারে একজনের জন্য ১ টাকা হয়তো কিছুই না। কিন্তু আপনি যদি সামগ্রিক হিসেব করেন আর সেখান পুরো দেশের হিসেব টানেন তাহলে দেখবেন প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা এভাবে গ্রাহকদের পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই টাকা যার পকেটেই যাক তা অবৈধ। কারণ এই টাকার তো কোনো হিসেব নেই।’

অপারেটরগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন বিটিআরসি’কে এসব বিষয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েক দফায় অভিযোগ জানানো হলেও কোন সুরাহা পায়নি বলে অভিযোগ করেন মহিউদ্দীন আহমেদ। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে সংস্থা একরকম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর এ বিষয়ে একটি গণশুনানির আয়োজন করে বিটিআরসি। আমরা সেখানে গেলেও একটি টেলিকম অপারেটরকে সেখানে হাজির করতে পারেনি বিটিআরসি। তখন আমরা বিটিআরসি’কে জিজ্ঞেস করলাম যে, আমরা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি তাদেরকেই যদি শুনানিতে আনা না যায় তাহলে এর সমাধান কী হবে? বিটিআরসি তখন আমাদেরকে জানালো যে, অপারেটরগুলোর সঙ্গে তারা আলোচনা করে ৯০ দিনের মধ্যে আমাদেরকে আপডেট জানাবেন। তাদের সেই ৯০ দিন আজও আসেনি। কাজেই বিটিআরসি কাছ থেকে আমরা আর কোন সুরাহার আশা করি না।’

এসব বিষয়ে অপারেটরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি কোনো অপারেটর বা অপারেটরগুলোর কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এছাড়া মুঠোফোন অপারেটরগুলোর সংস্থা অ্যামটবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন সংস্থাটির নেতারাও।

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?