বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারী ,২০২০

Bangla Version
  
SHARE

বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১১:৫৯:৫২

টেম্পুর হেলপার থেকে ৩০০০ কোটি টাকার মালিক মাদক সম্রাট মাসুদ

টেম্পুর হেলপার থেকে ৩০০০ কোটি টাকার মালিক মাদক সম্রাট মাসুদ

ঢাকা : নাম তার মো. মাসুদ। বাড়ি মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে। টেম্পুর হেলপার থেকে আজ সে ৩০০০ কোটি টাকার মালিক। আছে একাধিক বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দেশে মাদক চোরাচালানের শীর্ষে নাম তার। মাদক চোরাচালান থেকে তার মাসিক আয় প্রায় ৩ কোটি টাকা। বিভিন্ন সময় তার নামে একাধিক মামলাও হয়েছে। অথচ কখনো গ্রেফতার হতে হয়নি তাকে।

যেভাবে শুরু:

গরীব ঘরের সন্তান ছিল মাসুদ। চার ভাইয়ের মধ্যে সে তৃতীয়। বাবা ইমান আলী ছিলেন একজন কৃষক। ফলে পড়াশোনার সুযোগ হয়নি তার। আজ থেকে ২২ বছর আগে বাবার সঙ্গে অভিমান করে ঢাকায় আসে সে। প্রথমে সাভারের আমিন বাজারে টেম্পুতে হেলপারির মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু হয় তার। এরপর হয়ে যায় টেম্পু চালক।

এরমধ্যে ওই সময়ে ফেনসিডিলের আরদ হিসেবে পরিচিত আমিন বাজারের মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সম্পর্ক তৈরি হয় তার। শুরু হয় ফেনসিডিল আনা নেওয়ার কাজ। এক সময় নিজেই বিক্রি করতে শুরু করে সে। এর কিছুদিনের মধ্যে চাকরি পেয়ে যায় গুলশানের একটি ওয়ার হাউজে। সেখান থেকে বিদেশী মদের ব্যবসাও রপ্ত করে নেয় সে। চাকরি ছেড়ে নিজেই শুরু করে ব্যবসা। ওয়ার হাউজ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে গুলশানের বিভিন্ন বাসা, কূটনৈতিক কার্যালয় ও বারে বিদেশী মদ ও বিয়ার সরবরাহ শুরু করে সে। আয় রোজগারও ভালই হতে থাকে। ধীরে ধীরে তারও আধিপত্য বাড়তে থাকে। অবশেষে হয়ে উঠে মাদক সম্রাট।

কিভাবে বিক্রি করে:

এক সময় নিজে মদ-বিয়ার সরবরাহ করলেও এখন তার রয়েছে নিয়োগপ্রাপ্ত একাধিক কর্মচারী। এদের মধ্যে মাসুদের ম্যানাজারের দায়িত্বে রয়েছে বরিশালের আসাদ। হিসেবের দায়িত্বে রয়েছে মাসুদের ভাতিজা রিকন। এছাড়া কুষ্টিয়ার সম্রাট, মানিকগঞ্জের বোরহান ও উত্তমসহ আরো অন্তত ২০ থেকে ৩০ জনের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে তার। যারা গুলশানের ‘কসবন‘ ও ‘ইস্টার্ন’ ডিপ্লোমেটিক ওয়ার হাউজ থেকে মদ-বিয়ার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বার, ক্লাব, হোটেল, রেস্টুরেন্ট চোরাচালানের মাধ্যমে সরবরাহ করে থাকে। এজন্য রাতের শেষ সময়টাকে বেছে নেয় তারা। কারণ ওই সময় রাস্তা ফাঁকা ও প্রশাসনের নজরদারি কম থাকে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের একাধিক কর্মকর্তার সাথে তার মাসিক চুক্তি রয়েছে। এরপরও র্যা পিড একশন ব্যাটালিয়ান-র্যা ব একাধিকবার অভিযান চালিয়ে মাসুদের মাদক আটক করেছে। মামলাও করেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গুলশান জোনের সাবেক পরিদর্শক লায়েকুজ্জামান বলেন, মাসুদ মদের একটি চালান নিয়ে যাচ্ছে এমন সংবাদ পাওয়ার পর তাকে ধাওয়া করি আমরা। কিন্তু আমাদের গাড়ি কাছাকাছি যাওয়ার পর মাসুদের গাড়ি সড়কদ্বীপের উঠিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।

একইভাবে চলতি বছরের ২৩ মে রাজধানীর মুগদা থেকে ২৩২৪ ক্যান বিয়ার ও ১৭৮ বোতল বিদেশী মদসহ মাসুদের একটি চালান আকট করে র‌্যাব। এসময়ও মাসুদ পালিয়ে যায়, তবে আটক করা হয় গাড়ির চালককে। মাদক চোরাচালানের জন্য মাসুদের রয়েছে ১০ থেকে ১৫টি প্রাইভেটকার। তবে সেগুলোর কোনোটাই নিজের নামে নয়। বেনামে গাড়ির কাগজ করে মাসুদ। ফলে আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে ঠিকই বের হয়ে যায়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মাসুদের নামে মামলা রয়েছে চারটি।

মাসুদের গ্রাহক যারা:
মাসুদের বিদেশী মদ-বিয়ারের গ্রাহক মূলত বার, ক্লাব, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট। মহাখালীর রুচিতা বারসহ একাধিক বারের পার্টনারও সে। এছাড়া রাজধানীর উত্তরা, মগবাজার, কাকরাইল, পল্টন, সাভারের গলফ ক্লাব, সিলেট, বগুরা, চট্টগ্রাম, বরিশালের কুয়াকাটা, নারায়ণগঞ্জ, গাজিপুরসহ ২৬ জেলার বার, ক্লাব, হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্য তার। এ নিয়ে গুলশানের অন্যন্য মাদক চোরাকারবারীদের সাথে চরম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে সে।

কত সম্পদ মাসুদের:
মাসুদের ঘনিষ্টজনেরা জানিয়েছেন, প্রায় ৩০০০ কোটি টাকার মালিক সে। রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বরে তার একটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে। পল্লবীর ‘এ‘ ব্লকের ১৬ নম্বর লেনে রয়েছে আরো একটি ৭ তলা বাড়ি। এছাড়া সাভার, গাজিপুরেও তার জমি রয়েছে। গাজিপুরে একটি গার্মেন্টস কারখানাও করেছে সে। হরিরামপুরে রয়েছে একটি ইট ভাটা। রাজধানীর মিরপুর রোডে চলাচল করে ৮টি বাস। রয়েছে একাধিক ভেকু ও ড্রাম ট্রাক। সম্প্রতি বনানী ডিওএইচএসে ৩ কোটি টাকা মূল্যে একটি ফ্লাট কিনেছে সে। এছাড়া সম্প্রতি অনুমোদন পাওয়া চারটি বারের পার্টনার সে। রাজধানীর ডেমরায় ‘হলদি’ নামে একটি চাইনিস রেস্টুরেন্ট ও ফার্মগেটে রয়েছে একটি রুফটপ রেস্টুরেন্ট। ব্রাক ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকে রয়েছে তার একাউন্ট। শুরুতে এক কোটি টাকা জমা দিয়ে ব্যাংক একেকটি একাউন্ট খুলে সে। সম্প্রতি ঠিকাদারীতে নাম লিখিয়ে তার অবৈধ সম্পদ বৈধ করতে চাচ্ছে সে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানান, সরাসরি মাদক না পেলে কাউকে গ্রেফতার করতে পারেন না তারা। তবে যদি মাদক ব্যবসার সঙ্গে কারো সংশ্লিষ্টতার বিষয় চলে আসে, তাহলে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করতে পারেন তারা। ইতিমধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। কয়েকজনের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

আর র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের বেশিরভাগ অভিযানেই আটক হয় গাড়ি চালক বা মাদক বহনকারীরা। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে মাদকদ্রব্যগুলোর মালিকের নাম জানা গেলেও সঠিক ঠিকানা পাওয়া যায় না। ফলে মামলায় আসামী হিসেবে মূল মালিকের নাম আসলেও তাকে আটক করা কষ্টকর হয়ে যায়।

 

 

এই বিভাগের আরও খবর

আজকের প্রশ্ন

ঢাকার সিটি নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট হলে জনগণের রায় প্রতিফলিত হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আপনিও কি তাই মনে করেন?