রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ,২০১৯

Bangla Version
  
SHARE

রবিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৯, ১০:৫১:৫৯

মহানবী (সাঃ) যেভাবে জিনদের ইসলামের দাওয়াত দিতেন

মহানবী (সাঃ) যেভাবে জিনদের ইসলামের দাওয়াত দিতেন

ঢাকা : কোরআনের শতাধিক আয়াতে জিন শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। মানুষের মতো তারাও আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের জন্য আদিষ্ট। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি মানুষ ও জিন জাতিকে কেবল আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা : জুররিয়্যাত, আয়াত : ৫৬) মানবজাতির মতো তাদের ভেতরও আল্লাহ নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে জিন ও মানব সম্প্রদায়! তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে রাসুল আসেনি, যারা তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ বর্ণনা করেছে।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৩০)

কোরআনের বর্ণনায় জিন জাতির ইসলাম গ্রহণ:

রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও জিনদের মধ্যে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। কোরআন ও হাদিসের একাধিক বর্ণনা থেকে জিনদের সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর সাক্ষাৎ প্রমাণিত হয়। হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, রাসুল (সা.) জিন জাতির কাছে একাধিকবার দ্বিনের দাওয়াত নিয়ে যান এবং তাঁর হাতে জিনদের এক ও একাধিক দল ইসলামও গ্রহণ করে। পবিত্র কোরআনে ‘জিন’ নামে একটি স্বতন্ত্র সুরা রয়েছে। যার শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘বলুন! আমার প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়েছে, জিনদের একটি দল মনোযোগ দিয়ে (কোরআন) শ্রবণ করেছে এবং বলেছে, আমরা এক বিস্ময়কর কোরআন শ্রবণ করেছি, যা সঠিক পথের নির্দেশ করে। ফলে আমরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমরা আমাদের প্রতিপালকের সঙ্গে কাউকে শরিক করব না।’ (সুরা: জিন, আয়াত : ১-২)

সুরা আহকাফেও এমন একটি ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। যেখানে স্বজাতির মধ্যে জিনদের ইসলাম প্রচারের বিবরণও এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ করো! যখন আমি তোমার প্রতি জিনদের একটি দলকে আকৃষ্ট করেছিলাম, যারা কোরআন পাঠ শুনেছিল। যখন তারা তার নিকট পৌঁছাল, তখন তারা বলল, চুপ করে শোনো। কোরআন পাঠ শেষে তারা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারী হিসেবে ফিরে গেল। হে আমাদের সম্প্রদায়, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। আল্লাহ তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং তোমাদের মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন।’ (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ২৯-৩১)

আল্লামা ইবনে ইসহাকের সূত্রে আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এ ঘটনাকে হিজরতের পূর্বে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তায়েফ থেকে ফেরার পথে এক উপত্যকায় নামাজ আদায় করছিলেন। তখন জিনদের একটি দল তাঁর কোরআন তিলাওয়াত শুনে থেমে যায় এবং রাসুল (সা.)-এর ঈমানের ঘোষণা দেয়। সম্ভবত তায়েফবাসীর আচরণে তিনি যে ব্যথা পেয়েছিলেন, তার সান্ত্বনাস্বরূপ আল্লাহ তাঁর প্রতি জিনদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেন। আল্লামা ইবনে ইসহাক ও ইবনে সাদের মতে, সেই দলে দুই গোত্রের ৭০ থেকে ৯০ জন জিন উপস্থিত ছিল।

রাসুল (সা.) যেভাবে জিনদের ভেতর দাওয়াত দেন:

ড. খালেদ বিন উসমান আস-সাবত বলেন, রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে জিনদের ছয়টি পৃথক সাক্ষাতের বর্ণনা পাওয়া যায়। যার মধ্যে দুইবার মক্কায়, তিনবার মদিনায় এবং একবার মদিনার বাইরে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। কখনো তিনি একা ছিলেন আবার কখনো তাঁর সঙ্গে সাহাবিদের কেউ উপস্থিত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কখনো নিজে তাদের কাছে দ্বিনের দাওয়াত নিয়ে যেতেন আবার কখনো কখনো জিনরাও তাঁর কাছে আসত। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদিসে বলা হয়েছে, মক্কায় অবস্থানকালে একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের ভেতর কেউ যদি জিন বিষয়ে আগ্রহী হও, তবে আমাকে অনুসরণ করো। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমি ছাড়া আর কেউ অগ্রসর হলো না। তিনি বলেন, আমরা চলতে চলতে মক্কার একটি উঁচু স্থানে পৌঁছালাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) পা দিয়ে একটি বৃত্ত এঁকে আমাকে তার ভেতর অবস্থান করার নির্দেশ দেন। তিনি এগিয়ে গেলেন এবং দাঁড়িয়ে কোরআন খুললেন। এমন সময় অন্ধকারে চারদিক ছেয়ে গেল। রাসুল (সা.) আমার আড়াল হয়ে গেলেন। আমি তাঁর আওয়াজ শুনতে পেলাম। এরপর অন্ধকার মেঘমালার মতো খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেল এবং তার একটি দল অবশিষ্ট থাকল। রাসুল (সা.) তাদের সঙ্গে ফজর পর্যন্ত অতিবাহিত করেন। (মাউসুয়াতুল হাফেজ ইব
নে হাজার আল হাদিসিয়্যা : ৪/৬০০)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত অপর হাদিসে পাওয়া যায়, এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে না পেয়ে সাহাবাগণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি ফিরে এসে বলেন, ‘আমার কাছে একদল জিন এসেছিল। আমি তাদের সঙ্গে যাই এবং তাদের সম্মুখে কোরআন তিলাওয়াত করি।’ অতঃপর নবী (সা.) আমাদের নিয়ে যান। আমাদেরকে তাদের চিহ্ন ও তাদের আগুনের চিহ্ন দেখান। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৫০)

জিনরা কোন কোন বিষয়ে আদিষ্ট:

জিন জাতি শরিয়তের কোন কোন বিধানের ব্যাপারে আদিষ্ট? এমন প্রশ্নের উত্তরে শায়খ আবদুল্লাহ বিন বাজ (রহ.) বলেন, ইসলামের যে বিধি-বিধান আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে তা জিন জাতির কাছেও পৌঁছেছে। তবে শরিয়ত পালনে তাদের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানি না। ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি অনুযায়ী বলা যায়, ঈমান, নামাজ, রোজা, হজসহ ইসলামের মৌলিক বিধানের ব্যাপারে মানুষ ও জিন উভয় জাতি সমানভাবে আদিষ্ট। আল্লাহ তাআলা সুরা আর রহমানের একাধিক আয়াতে ‘ফাবিআইয়ি আলায়ি রব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ (তোমরা দুই সম্প্রদায় তথা মানুষ ও জিন আল্লাহর কোন কোন নিদর্শন অস্বীকার করবে) বলে উভয় জাতিকে কোনো বিভেদ ছাড়াই সম্বোধন করেছেন। যা দ্বারা বুঝে আসে দ্বিনের মৌলিক বিষয়ে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আর অমৌলিক বিষয়ে উভয় জাতির মধ্যে কী কী পার্থক্য আছে তা আমাদের জানা নেই।

ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়াতে বলা হয়েছে, ‘কোনো সন্দেহ নেই ‘তাসদিক’ (ঈমান) ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে তারা আদিষ্ট এবং ‘তাকজিব’ (কুফরি) ছাড়াও অন্যান্য বিষয় থেকে তাদের বারণ করা হয়েছে। মৌলিক ও অমৌলিক বিষয়ে তারা তাদের মতো আদিষ্ট। যেহেতু তারা প্রকার-প্রকৃতিতে মানুষের মতো নয়, তাই আদেশ-নিষেধ বা শাস্তি বিধানের ক্ষেত্রে তারা মানুষের মতো নয়। হ্যাঁ, ইসলামের মৌলিক আদেশ-নিষেধ, হালাল-হারামের ক্ষেত্রে মুসলমানের মধ্যে কোনো ব্যবধান আছে বলে আমি জানি না।’ (মাজমুউ ফাতাওয়া শায়খুল ইসলাম আহমদ ইবনে তাইমিয়া : ৪/২৩৩)

পরকালে জিন জাতির পরিণতি কী হবে:

মানবজাতির মতো জিন জাতিও আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের ব্যাপারে আদিষ্ট। সুতরাং পরকালে তাদের কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে এবং অবাধ্যতার জন্য শাস্তির মুখোমুখি হবে—এ ব্যাপারে প্রাজ্ঞ ইসলামী ব্যক্তিত্বরা একমত। পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে বলা হয়েছে, অবিশ্বাসী ও অবাধ্য জিনরা মানুষের মতো শাস্তি ভোগ করবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি অবশ্যই জিন ও মানুষ উভয়ের মাধ্যমে জাহান্নামকে পূর্ণ করব।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ১১৯)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭৯)

তবে জিনদের মধ্যে যারা আল্লাহর অনুগত তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে কি না সে ব্যাপারে মতভিন্নতা রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তিই জিনদের জন্য পুরস্কার। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আল্লামা সুয়ুতি (রহ.) বলেন, ‘অবিশ্বাসী জিনরা জাহান্নামে যাবে—এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। তবে মুমিন জিনরা আনুগত্যের প্রতিদানস্বরূপ জান্নাতে প্রবেশ করবে কি না, সে ব্যাপারে মতভিন্নতা রয়েছে। বেশির ভাগের মতে তারা জান্নাতে যাবে এবং এটাই উত্তম মত।’ (আল আশবাহ ওয়ান-নাজায়ির, পৃষ্ঠা ২৬১) এই মতের পক্ষে কোরআনের একটি আয়াত থেকেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেছেন, ‘যে তার প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়াকে ভয় পায়, যার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত। সুতরাং তোমরা উভয় সম্প্রদায় (মানুষ ও জিন) আল্লাহর কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?’ (সুরা : আর রহমান, আয়াত : ৪৬-৪৭)

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?