শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

রবিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:২৪:১২

আতঙ্কের নাম সাইবার অপরাধ

আতঙ্কের নাম সাইবার অপরাধ

ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। পর্নোগ্রাফি, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, ওয়েবসাইট হ্যাকিং, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং করে টাকা উত্তোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারসহ সাইবার অপরাধ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের চরিত্র হনন করা হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার পর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের শিকার হয়। যদিও ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে তা আবার আপলোড করে আইসিটি ডিভিশন। এ অবস্থায় পুলিশের সিআইডির অধীনে বড় আকারে ‘সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টার’ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের অধীনে সাইবার ক্রাইম ডিভিশন কাজ করছে। এরই মধ্যে ডিএমপির পক্ষ থেকে আইসিটি মন্ত্রণালয়কে ছয়টি সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।

জানতে চাইলে ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশনের উপ-কমিশনার আলিমুজ্জামান বলেন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি সচেতন মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন দিক থেকে সাইবার সচেতনতার জন্য প্রচারণা দরকার। নিষিদ্ধ পর্নো সাইটগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের। পোলারিশ ফরেনসিক লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী ও প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রতিটি ঘটনার প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত প্রয়োজন। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইট হ্যাকিংয়ের একটি ঘটনায়ও কি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? কয়টি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে? সরকার সাইবার নীতিমালা প্রণয়ন করলেও অনেক প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। জোহা বলেন, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে দ্রুততর সময়ের মধ্যে গেটওয়েতে ফিল্টার হার্ডওয়্যার বেইজড দিয়ে মনিটরিং করতে হবে। এতে সংবেদনশীল রাষ্ট্রবিরোধী কোনো তথ্য অনলাইনে অপপ্রচার হলে তা মুহূর্তে অপসারণসহ যিনি তা করছেন ইলেকট্রনিক ভৌগোলিক অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হবে। ডিএমপি সূত্র বলছে, ২০১৭ সালে ৫৬৬টি অভিযোগ পায় সাইবার ক্রাইম ইউনিট। এর মধ্যে ফেক আইডি ২০, আইডি হ্যাক হয়েছে ২১ ও মানহানিকর ১৮ ভাগ। এসব অভিযোগের মধ্যে মামলা হয়েছে ১০০টি। এরই মধ্যে ২৮টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে ৬০ ভাগ। তবে গতকাল পর্যন্ত ১২৮টি মামলার তদন্ত চলছে। কিছু মামলা সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে।

সাইবার অপরাধকে বিচারের আওতায় আনতে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকার। প্রথম বছরে ট্রাইব্যুনালে তিনটি মামলা ছিল। ২০১৪ সালে ৩২, ২০১৫ সালে ১৫২, ২০১৬ সালে ২৩৩টি মামলা ট্রাইব্যুনালে আসে। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ফেসবুকসহ ইন্টারনেটে সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছে ৭০ ভাগ নারী। যাদের বয়স ২৫ বছরের নিচে। সম্প্রতি সাইবার ক্রাইম ইউনিটে উপস্থিত হয় ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। বাবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। আতঙ্কগ্রস্ত ওই শিক্ষার্থী জানায়, ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেটির সঙ্গে তার নিয়মিত ভিডিও চ্যাট হতো। এক রাতে ছেলেটির কথামতো সে শরীরে পোশাক না রেখে তার সঙ্গে কথা বলে। কিছুদিন পর ছেলেটি তার সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে ওই ছবি ফেসবুকে ছেড়ে দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতে। মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। প্রথমে বাসার আলমারি থেকে টাকা চুরি করে ওই ছেলেটিকে বিকাশ করতে থাকে। এরপর মায়ের সোনার অলঙ্কার বিক্রি করে টাকা দেয়। এর পরও যখন ছেলেটি তাকে হুমকি দিয়ে টাকা দাবি করতে থাকে তখন মেয়েটি বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে টাকা ধার করে বিকাশ করে ওই ছেলেকে পাঠাতে থাকে। এভাবে তিন লাখ টাকা পাঠানোর পর আর কোনো উপায় না পেয়ে সে পুিলশের কাছে অভিযোগ দেয়। তবে শর্ত দেয় তার বাবা-মাকে যেন বিষয়টি না জানানো হয়। যদিও তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ পেয়েছে ওই অপরাধী আর কেউ নয়। আরেকটি মহিলা। পুরুষ হয়েই সে তার সঙ্গে প্রতারণা করেছিল। তবে সম্মানের কথা ভেবে মেয়েটির পরিবার কোনো মামলা করতে রাজি হয়নি।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, সাইবার অপরাধ তদন্তে পুলিশের বিশেষ ইউনিট ‘সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টার’ গঠন করা হচ্ছে। সিআইডি কার্যালয়ে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেটিভের অর্থায়নে ২৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সাইবার ইনভেস্টিগেশন সেন্টারেই হবে এর প্রধান কার্যালয়। গত বছর শেষের দিকে ‘সাইবার ক্রাইম ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন’ নামের একটি ইউনিট গঠনের জন্য পুলিশ সদর দফতর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সর্বশেষ ২০ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা চেয়ে পাঠানো হয় পুলিশ সদর দফতরে। এতে ব্যুরোর বিষয়ে তাদের আপত্তির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এরই মধ্যে পুলিশ সদর দফতর তাদের ব্যাখ্যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক এস এম আক্তারুজ্জামান বলেন, ব্যুরোর ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তবে সিআইডির অধীনেই এই বিশেযায়িত ইউনিটের কার্যক্রম চলবে। প্রধান হবেন একজন ডিআইজি।

ডিএমপির ছয় সুপারিশ : সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অপরাধ কমিয়ে আনতে ডিএমপির পক্ষ থেকে তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে ছয়টি সুপারিশ দেওয়া হয় ২ মার্চ। এতে উল্লেখ করা হয় ছয়টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে সাইবার অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে ফেসবুকসংক্রান্ত একটি সুপারিশের বিষয়ে অগ্রগতি এসেছে বলে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন ডিএমপির একজন অতিরিক্ত উপকমিশনার। তিনি বলেন, ‘বার্সেলোনায় ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সফল বৈঠক শেষে মন্ত্রী মহোদয় এ বিষয়ে আমাকে অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন। এরই মধ্যে আমরা কিছু সুফল ভোগ করতে শুরু করেছি।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ডিএমপির ওই ছয়টি সুপারিশ প্রদানের পরপরই সংশ্লিষ্ট সচিবকে ডেকে মন্ত্রী মহোদয় কাজ ভাগ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

সুপারিশগুলো হলো— ১. অন্য দেশের সঙ্গে ‘পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি’ করা। ২. আইএসপি ও মোবাইল কোম্পানির ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ব্রাউজার লগ রাখা বাধ্যতামূলক করা। ৩. পাবলিক ওয়াইফাইগুলোকে নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা। এজন্য প্রত্যেক ব্যবহারকারীর জন্য ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড বাধ্যতামূলক করা। ৪. দেশে পুলিশের অধীনে ফরেনসিক ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা। ৫. আইসিটি ডিভিশনের আওতায় বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ৬. আন্তদেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

 

আজকের প্রশ্ন

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বিএনপির নেতারা মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি করছে। আপনিও কি তাই মনে করেন?