রবিবার, ২২ অক্টোবর ,২০১৭

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ১৬ জুন, ২০১৭, ১০:৩১:২৭

তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে নানা উদ্যোগ বিএনপির

তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে নানা উদ্যোগ বিএনপির

ঢাকা: তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে বিএনপি। দুই মেয়াদে ক্ষমতার বাইরে থাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যে হতাশা দেখা দিয়েছে তা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি তরুণ প্রন্মেকে আকৃষ্ট করতে দলটি বিভিন্ন পরিকল্পনা তৈরি করছে বলে জানা গেছে।

বিএনপির শীর্ষ মহল ও থিঙ্কট্যাংকরা মনে করেন, দলটির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে এমন ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছিল। এ কারণে তারা নবম সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য পায়। তাই বিএনপিও আওয়ামী লীগের অনেকটা কাছাকাছি ধাঁচের পরিকল্পনা তৈরিতে এখন ব্যস্ত। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনের আগে যে ‘ভিশন ২০২১’ উপস্থাপন করেছিল, তার প্রধান বিষয় ছিল ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগান। ভোটারদের কাছে বিশেষ করে তরুণদের ওপর সেটি বেশ প্রভাব ফেলেছিল।

বিএনপির নেতারা মনে করেন, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ তাদের এ রূপকল্পের মাধ্যমে রাজনীতির মাঠে সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির কাছ থেকে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা শোনা যায়নি। দেরিতে হলেও দলটি হয়তো এখন অনুধাবন করেছে যে তাদের প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনীতি এবং ভোটারদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে হলে একটি রূপকল্প উপস্থাপন করা জরুরি। এ কারণেই বিএনপি সম্প্রতি ‘ভিশন ২০৩০’ উপস্থাপন করল।

এ ব্যাপারে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমরা মনে করেছি দেশের সামনে আমাদের ভিশনটা তুলে ধরা দরকার। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজনীতি নিয়ে বিএনপি কী ভাবছে সেগুলো তো একটা সময় জানাতে হবে জনগণকে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতি নিয়ে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চায়।

বিএনপির ‘ভিশন ২০৩০’ প্রণয়নে দলকে সহায়তা করেছেন দলটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাবেক আমলা, বিশ্ববিদ্যালযের অধ্যাপক এবং পেশাজীবীরা। তাদের অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেকটাই বদলে গেছে। ভোটারদের মধ্যে ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী ভোটারদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। দেশ পরিচালনায় তাদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ মনে করেন, রাজনৈতিক রূপকল্প থাকা এখন সময়ের চাহিদা। তিনি বলেন, যুগ পাল্টাচ্ছে, সময় পাল্টাচ্ছে। প্রন্মে থেকে নতুন প্রজন্মের সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের ধ্যান-ধারণার সঙ্গে ট্র্যাডিশনাল নেতৃত্বের একটি দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। দূরত্ব কমানোটা রাজনৈতিক দলের জন্য বড় কাজ। শুধুমাত্র সরকারের সমালোচনা না করে, দল হিসেবে বিএনপির পরিকল্পনা কী সেটি মানুষের সামনে তুলে ধরতে চাইছে দলটি।

এ কারণেই তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে বিএনপি রোজার ঈদের পর সহায়ক সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন করবে বলে জানা গেছে। চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াসহ দলের সিনিয়র নেতারা ইতিমধ্যে বলেছেন, ঈদের পর সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেয়া হবে। এছাড়াও একাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় ইশতেহার তৈরির কাজও চলছে বলে জানা গেছে। বিএনপির থিঙ্কট্যাংকরা মনে করেন, মনভোলানো কথা দিয়ে তরুণ প্রজন্মর ভোটারদের আর আকৃষ্ট করা যাবে না। তাই দলের চাওয়া-পাওয়াকে যদি ‘দালিলিক-লিখিতভাবে’ যুক্তিসহকারে উপস্থাপনা করা যায়, তাহলে তরুণ প্রন্মেের কাছে দলের আকর্ষণ বৃদ্ধি পেতে পারে। বিএনপি নেতারা বলেন, এ দৃষ্টিকোণ থেকেই ইতিমধ্যে শিক্ষা ও পরিবেশের ওপর দুটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সামনে আরো বিষয়ভিত্তিক সেমিনার আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, তরুণ প্রন্মেের ভোটারদের আস্থা অর্জনে বিএনপি আগামীতে সংসদ নির্বাচনের জন্য যে মনোনয়ন দেবে, তাতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ ভাগ তরুণ নেতানেত্রীর নাম থাকবে। ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে যে কমিটি গঠিত হয়, সেখানেও ২০ ভাগ তরুণ প্রজন্মের নেতানেত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে দলের মধ্যে প্রাণশক্তি ফিরে পেয়েছে বলে দলের নেতারা মনে করেন।

এ প্রসঙ্গে সদ্য ঘোষিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়া তরুণ প্রজন্মের পেশাজীবী এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানবকণ্ঠকে বলেন, কমিটি ঘোষণার পর কমিটিতে স্থান পাওয়া পেশাজীবী নেতারা বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় পেশাজীবী নেতারা খালেদা জিয়ার কাছে অনুরোধ জানান, এর মধ্যে এক তরুণ নেতাকে পেশাজীবী সংগঠনের কাজে আরো বেশি মনোনিবেশ করার সুবিধায় বিএনপির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে। কিন্তু খালেদা জিয়া তা নাকচ করে দিয়ে বলেন, কোনো অসুবিধা নেই। দলে তরুণ নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে। তারও (খালেদা জিয়া) বয়স হয়েছে। তাই তার আর দলীয় নেতৃত্বে সক্রিয়ভাবে বেশি দিন থাকার সম্ভাবনা নেই। তারেক রহমান মূল নেতৃত্বে আসবে। তাই দলে তরুণ নেতৃত্বের সমাবেশ ঘটাতে হবে।

ওই তরুণ পেশাজীবী নেতা জানান, খালেদা জিয়া বলেছেন, এবারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে পরিচ্ছন্ন, মার্জিত ও শিক্ষিত তরুণ নেতা-নেত্রীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি সব সময়েই তরুণ প্রন্মেকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৪০ বছর। প্রতিষ্ঠাকালেই দলে বহুসংখ্যক তরুণ কিন্তু মেধাবী ও উদ্যোমী ব্যক্তিত্বদের মিলন ঘটিয়েছিলেন। আমাদের নেতা তারেক রহমানও বয়সে তরুণ। এবারের বিএনপি যে কমিটি করেছে, তাতে তরুণ নেতানেত্রীদের সমাবেশ ঘটেছে। সুতরাং এখন কেন, বিএনপি সব সময়েই তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করেই কাজ করে।

দুই বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে তৃণমূলে চিঠি: জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূলে দুটি চিঠি দেয়া শুরু করেছে বিএনপি। নির্বাচন কমিশন কিছুদিনের মধ্যেই ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শুরু করবে। বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েই তৃণমূলে এ চিঠি পাঠাচ্ছে দলটি। ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিষয়টি সতর্ক পর্যবেক্ষণ এবং নির্বাচনী আসনের সীমানা সংক্রান্ত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দলের কেন্দ্রীয় দফতরে প্রতিবেদন পাঠাতে ওই দুই চিঠিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে দলের সহদফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু জানান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত চিঠি দুটি তৃণমূলে পাঠানো শুরু হয়েছে।

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করবে নির্বাচন কমিশন। হালনাগাদের কাজ চলতি বছরের শেষ দুই-তিন মাসের মধ্যে করা হবে বলে জানা গেছে। বিএনপির অভিযোগ, ২০০৮ সালে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়নের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি নেতাকর্মীসহ অনেক সাধারণ মানুষ সে তালিকা থেকে বাদ পড়ে। তারপর ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালে যতবারই ভোটার তালিকা হালনাগাদ হয়েছে প্রতিবারই বজায় ছিল বাদ পড়ার সে ধারা।

বিশেষ করে যেসব গ্রামে বা পাড়া মহল্লায় বিএনপি সমর্থকদের সংখ্যা বেশি সেখানেই অনিয়ম হয়েছে ভোটার তালিকা প্রণয়নে। মামলার কারণে আত্মগোপনে বা পালিয়ে থাকা বিএনপি নেতাকর্মীদের অনেকেই ঠিক সময়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। অভিযোগ ছিল তথ্য সংগ্রহকারীরা আইন অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের নিবন্ধিত করার কথা থাকলেও তারা অনেক ক্ষেত্রে তা করেনি। ফলে অনেক নারী ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

এ কারণে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণ বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে এ চিঠি দেয়া হচ্ছে। বিএনপি মহাসচিব স্বাক্ষরিত চিঠি দুটি পাঠানো হচ্ছে দলের জেলা ও মহানগর শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের কাছে। তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তারা যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে বৈঠক বা সুবিধামতো প্রক্রিয়ায় দলের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের এ ব্যাপারে কেন্দ্রের নির্দেশনা জানিয়ে দেয়। সে নির্দেশনা বাস্তবায়নে তৃণমূল নেতাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় যেন জেলা ও মহানগর নেতারা বিষয়টি সতর্কতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে লক্ষ্য রাখেন এবং দেখভাল করেন। দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের চিঠির অনুলিপি দেয়া হয়েছে যাতে কেন্দ্রের এ নির্দেশনাটি যথাযথভাবে জেলা ও মহানগর নেতারা পালন করছে কিনা সেটা নজরদারি করেন।

বিএনপি কেন্দ্রীয় দফতর সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের অনেকগুলো নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির ভোটের প্রভাববলয় ভাঙতে এটা করেছিল তৎকালীন জরুরি সরকার। পাশের আসনের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছিল বিএনপি সমর্থিত অনেক প্রার্থীর ইউনিয়ন। এতে নির্বাচনের মাঠে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বিএনপি। এ ছাড়া সীমানা পুনর্নির্ধারণের কারণে তৃণমূলে তৈরি হয়েছিল নেতৃত্বের কোন্দল।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় নির্বাচন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ায় সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে কমিশনের সঙ্গে যৌক্তিক দেনদরবার করতে পারেনি বিএনপি। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাই এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় দেনদরবারের উদ্যোগ নেয়া হবে। সে জন্য তৃণমূল পাঠানো দ্বিতীয় চিঠিতে নির্বাচনী আসনের সীমানা সংক্রান্ত সমস্যা চিহ্নিত ও এ ব্যাপারে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এক মাস সময় দিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে যেন তারা সমস্যাগুলো লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় দফতরে জানান।

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

 

আজকের প্রশ্ন

কিছু সহিংসতা ও অনিয়ম হলেও সামগ্রিকভাবে ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে—সিইসির এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি একমত?