বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

শনিবার, ০৭ এপ্রিল, ২০১৮, ১১:৩৭:০৩

মহেশখালীর বাঁক থেকে ইউরোপের রাজধানীতে

মহেশখালীর বাঁক থেকে ইউরোপের রাজধানীতে

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি শিক্ষার প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এস এম তৌহিদুল মুস্তাফা রাইয়্যান একাধারে একজন গবেষক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ এবং দেশের অন্যতম পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন সেরা শিক্ষার্থীদের মাঝে অন্যতম। স্বপ্ন দেখতেন একজন গবেষক হয়ে দেশের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করবেন।

তাঁর স্বপ্ন সত্যি হয়ে ধরা দেয় ২০০৩ সালে। চার বছরের অনার্স শেষে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদ থেকে বিএসসি ইন অ্যাগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে রেকর্ড নম্বর নিয়ে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০০৯ সালে একই অনুষদের সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে এমএসসিতে আবারও প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন। সে বছরই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১১ সালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। কৃতী শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক, ইউনিভার্সিটি অ্যাওয়ার্ড, এস এম নাজমুল হক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট গোল্ড মেডেল, ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন (ইউজি সি) অ্যাওয়ার্ড, ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি স্কলারশিপ ও রমাপতি নাথ মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
এত অর্জনের পরও তার চিরচেনা লালিত স্বপ্ন গবেষণার মাধ্যমে দেশের কল্যাণসাধন বাস্তবায়নের তৃষ্ণা যেন কিছুতেই মিটছিল না। হঠাৎই ২০১১ সালে সেই স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে আমন্ত্রণ পান বেলজিয়াম সরকারের VLIR-UOS স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপের রাজধানীখ্যাত বেলজিয়ামে। সেখানে তিনি ইউরোপের সেরা উদ্ভাবনী বিশ্ববিদ্যালয় কু ল্যুভেন ও ভ্রাইয়ে ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলে (ভিইউবি) পানিসম্পদ প্রকৌশল বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। অধ্যয়নকালে ২০১২ সালে ফ্রান্সের নিস শহরে অনুষ্ঠিত হাইড্রোইউরোপ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। ইউরোপের স্বনামধন্য ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাছাইকৃত প্রায় ১২৫ জন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অর্জন করেন বেস্ট প্রেজেন্টেশন অ্যাওয়ার্ড।
২০১৩ সালে কু ল্যুভেন ও ভিইউবি থেকে পানিসম্পদ প্রকৌশল বিষয়ে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল টেকসই ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার উন্নতি। বরাবরের মতো এখানেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন তিনি; ২৫টি দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সেরা শিক্ষার্থী নির্বাচিত হন।
এরপর তাঁকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। সেরা ছাত্র হওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে বেলজিয়ামের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রফেসরের ল্যাবে স্কলারশিপসহ পিএইচডি করার আমন্ত্রণ পান। এখানে বলে রাখা ভালো, একই সময়ে তিনি বেলজিয়াম ছাড়াও জার্মানি, ডেনমার্ক ও কানাডার তিনটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপসহ পিএইচডি করার আমন্ত্রণ পান। কিন্তু তাঁর আজন্মলালিত স্বপ্ন দেশের জন্য কিছু করবেন; তাই বেলজিয়ামে বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা সমস্যার ওপর কাজ করার সুযোগ থাকায় তিনি এই বিষয়ে পিএইচডি করার সিদ্ধান্ত নেন।
বাংলাদেশে তিনিই প্রথম ক্রপ ওয়াটার মডেল ডেভেলপমেন্ট ও গাণিতিক মডেলভিত্তিক সেচ কৌশল প্রয়োগ করেন। ভালো গবেষকের স্বীকৃত হিসেবে ইতিমধ্যে ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ডক্টরাল স্কুল অব ভিইউবি আয়োজিত কনফারেন্সে বেস্ট পোস্টার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। গবেষণার পাশাপাশি তিনি কু ল্যুভেন ও ভিইউবিতে প্রাউন্ডওয়াটার হাইড্রোলজি ও গ্রাউন্ডওয়াটার মডেলিং বিষয়ে ক্লাস নিয়েছেন ও পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
সহধর্মিণীর সঙ্গে এস এম তৌহিদুল মুস্তাফা রাইয়্যানসহধর্মিণীর সঙ্গে এস এম তৌহিদুল মুস্তাফা রাইয়্যানদীর্ঘ চার বছর সফল গবেষণার পর তিনি বেলজিয়ামে কোয়ালিফিকেশন অব মডেল আনসারটেইনিটিস ইন গ্রাউন্ডওয়াটার ড্রট সিমুলেশনস আন্ডার ক্লাইমেট চেঞ্জ বিষয়ের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। শুধু তা–ই নয়, গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন পিএইচডি উইথ হাইয়েস্ট অনার, যা পিএইচডিতে হাইয়েস্ট গ্রেড প্রাপ্তির ফলে অর্জন করেছেন।
পিএইচডি গবেষণায় তিনি গ্রাউন্ডওয়াটার মডেলিংয়ের এক নতুন টেকনিক আবিষ্কার করেন যার মাধ্যমে মডেলের সব ধরনের অনিশ্চয়তা নির্ধারণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পানিপ্রবাহ ও পরিমাণ নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যাবে। তাঁর এই আবিষ্কার, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এর ফলে পানিদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অনুসন্ধানের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পানি ব্যবস্থাপনা কেমন হওয়া উচিত, তা সহজেই জানা যাবে এবং উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। যা বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে অতিপ্রয়োজনীয়। উল্লেখ্য, এই গবেষণালব্ধ আবিষ্কার বিশ্বে তিনিই প্রথম করেন এবং ইতিমধ্যে তাঁর এই গবেষণাপত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত বিশ্ববিখ্যাত ওয়াটার রিসোর্সেস রিসার্চ জার্নাল প্রকাশ করতে রাজি হয়েছে।
এস এম তৌহিদুল মুস্তাফা রাইয়্যান অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ ও কনফারেন্সে যোগ দিয়ে বিভিন্ন গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেছেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জার্নালে কনসেপচুয়াল মডেল আনসারটেইনটি কোয়ান্টিফিকেশন, বায়াসিয়ান টেকনিক, বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই সেচ ব্যবস্থাপনার ওপর ৭টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ এবং আরও ৮টি গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপন করেন। তিনি ৫টি আন্তর্জাতিক মাস্টার্স থিসিসের গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ও ৩টি আন্তর্জাতিক মাস্টার্স থিসিসের পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি বেলজিয়ামের ভ্রাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো হিসেবে গবেষণায় নিয়োজিত আছেন।
তাঁর জন্ম কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া ইউনিয়নের উত্তর নলবিলা গ্রামে।

নাবিলাহ জালাল: এমএস রিসার্চ ফেলো, ওয়াহেনিনগেন ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড রিসার্চ, দ্য নেদারল্যান্ডস।

আজকের প্রশ্ন

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বিএনপির নেতারা মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি করছে। আপনিও কি তাই মনে করেন?