বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ,২০১৯

Bangla Version
  
SHARE

সোমবার, ১৮ মার্চ, ২০১৯, ০১:১৮:৩৭

ভয়াল মুহূর্তের পুরো বর্ণনা দিলেন তামিম

ভয়াল মুহূর্তের পুরো বর্ণনা দিলেন তামিম

স্পোর্টস ডেস্ক: নিউজিল্যান্ড থেকে ভয়ঙ্কর স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটাররা। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন ক্রিকেটাররা। সেদিন চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দুঃসহ স্মৃতি এখনও ভুলতে পারছেন না তামিম ইকবাল।

ক্রিকেট বিষয়ক ওয়েবসাইট  ক্রিকইনফোর কাছে ভয়াল সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিলেন বয়ান দিলেন বাংলাদেশ ওপেনার তামিম ইকবাল। বর্ণনাটি ব্রেকিংনিউজের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

‘বাসে চড়ার আগে কী ঘটেছিল তা আমাকে ব্যাখ্যা করতে দিন। বুঝতে পারবেন, ওই দুই-তিন মিনিট কতটা পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। সাধারণত মুশফিক (রহিম) ও রিয়াদ ভাই (মাহমুদউল্লাহ) খুতবার সময়ও থাকেন, এজন্য আগেভাগেই আমরা জুমার নামাজে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম। বাস ছাড়ার কথা ছিল বেলা দেড়টার সময়, কিন্তু রিয়াদ ভাই সংবাদ সম্মেলনে গিয়েছিলেন। ওখানে কিছুটা সময় গেছে এবং সংবাদ সম্মেলন শেষে তিনি ড্রেসিংরুমে যান।

ড্রেসিংরুমে গিয়ে আমরা ফুটবল খেলতে শুরু করেছিলাম। তাইজুল (ইসলাম) হারতে চাচ্ছিল না, কিন্তু অন্যরা তাকে হারাতে চেয়েছিল। তাইজুল ও মুশফিক নিজেদের মধ্যে খেলছিল, সেখানে কয়েক মিনিট চলে যায়। এসব ছোটখাটো ব্যাপার শেষ পর্যন্ত আমাদের বাঁচিয়েছে।

তারপরই আমরা বাসে উঠলাম। পরিকল্পনা ছিল নামাজ শেষে টিম হোটেলে যাওয়ার, এজন্যই শ্রী (টিম অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাস চন্দ্রশেখরন) ও সৌম্য সরকার আমাদের সঙ্গে ছিল। ঐচ্ছিক অনুশীলন ছিল, যারা করতে চায়নি তারা হোটেলেই ছিল। আর যারা অনুশীলন করতে চায় তাদের মাঠে আসার কথা ছিল। এটাই ছিল আমাদের পরিকল্পনা।

বাসে আমি সবসময় বাঁ-দিকে ছয় নম্বর আসনে বসি। যখন আমরা মসজিদের কাছে যাচ্ছিলাম, প্রত্যেকে ওই সময় জানালার বাইরে তাকিয়ে কিছু দেখতে থাকলো। আমি দেখলাম একটি দেহ মাটিতে পড়ে আছে। আমরা ভেবেছিলাম হয় সে মদ্যপ, নয়তো অজ্ঞান হয়ে গেছে। তারপরও বাস চলছিল এবং মসজিদের কাছে থামলো। কিন্তু প্রত্যেকের মনোযোগ তখনও ছিল ওই পড়ে থাকা মানুষটার ওপর।
যখন এসব ঘটছিল, তখন আমার মনোযোগ ছিল অন্য আরেকজনের দিকে, রক্তাক্ত এবং সে পড়ে যাচ্ছিল। ঠিক ওটা দেখেই শুরু হয় আতঙ্ক।

আমাদের বাস মসজিদের কাছে একটি গাড়ির সামনে থামলো। আমরা দেখলাম বাস ড্রাইভার একজন নারীর সঙ্গে কথা বলছেন, যিনি কাঁপছিলেন আর কাঁদছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘ওখানে গোলাগুলি হচ্ছে, যেও না, যেও না।’

আমাদের বাস ড্রাইভার বললো আমরা মসজিদে যাচ্ছি। তিনি বললেন, ‘না, না, না, মসজিদে যেও না। মসজিদেই গোলাগুলি হচ্ছে।’ তিনি তখনও কাঁদছিলেন। প্রত্যেকে তার কথা শুনছিল, আমরা ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। ওই সময় আমরা মসজিদ থেকে ২০ গজ দূরে ছিলাম। বাস থেকে নেমে হেঁটে মসজিদে যাওয়াই তখন বাকি ছিল। খুব কাছে ছিলাম। মসজিদের আশপাশে আমরা আরও কয়েকটি রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেছিলাম।

যখন আমরা আরও মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখলাম, বুঝতে পারছিলাম না কী করবো। ভয়ে অনেকে নামাজের টুপি খুলে ফেললো। আমরা বুঝতে পারলাম, কিছু একটা ঘটছে। যারা পাঞ্জাবি পরা ছিল, তারা জ্যাকেট পরলো। আর কী করার ছিল?

এরপরই আমরা বাসের মেঝেতে শুয়ে পড়লাম। এভাবে কেটে গেছে ৭ বা ৮ মিনিট। আমরা তখনও বুঝতে পারিনি ঠিক কী ঘটছে। কিন্তু বুঝেছি সহিংস ঘটনা ঘটছে।

আমরা অনেকক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। আমার দিকে দেখুন, আমি এখনও ঠিকমতো কথা বলতে পারছি না। বাস ড্রাইভারকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যেতে বললাম, কিছু একটা করতে বললাম। কিন্তু তিনি নিথর হয়ে বসেছিলেন। সবাই তার সঙ্গে চিৎকার করছিল, আমিও চিৎকার করছিলাম। ৬/৭ মিনিট সেখানে কোনও পুলিশ আসেনি।

তারপর পুলিশ এলো, যেভাবে তাদের বিশেষ বাহিনী মসজিদে ঢুকলো তাতে আমরা অসাড় হয়ে পড়লাম। আমার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। আরও অনেক আহত ও রক্তাক্ত মানুষ মসজিদের বাইরে আসতে থাকলো।

ওই সময় আমরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। আমরা চিৎকার শুরু করলাম, ‘আমাদের যেতে দিন!’। কেউ বললো, ‘আমরা বাইরে বের হলে যদি গুলি করে?’ আরেকজন বললো, ‘বাসের মধ্যে থাকলেই আমরা বেশি বিপদে পড়বো।’ আমারও মনে হলো বাসের বাইরে যেতে পারলে পালানোর সুযোগ থাকবে। কিন্তু কোথায় যাবো? বাসের দুটি দরজাই তো বন্ধ!

কোনও কারণে ওই সময় ড্রাইভার ১০ মিটার সামনে এগিয়ে নিলো বাস। আমি জানি না কেন সে এটা করলো। আমরা ভেঙে পড়েছিলাম। মাঝখানের দরজায় আমরা জোরে জোরে ধাক্কা দিতে থাকলাম। কেউ দরজায় লাথি দিচ্ছিল, কেউ ঘুসি মারছিল।

যখন বাস সামনে নিলো, তখন আমি আপনাকে (ক্রিকইনফো সাংবাদিক মোহাম্মদ ইসাম) ফোন করলাম। আপনি ভেবেছিলেন আমি বুঝি মজা করছি। ওই সময় আমার বলার মতো অবস্থা ছিল না যে, ‘ইসাম ভাই, আমি সত্যি কথা বলছি।’ আপনি আমার কথা শুনছিলেন, ঠিক? আমি ভাষা হারিয়ে ফেললাম যখন মাজহার (আরেক সাংবাদিক) আমাকে কল করলো। বুঝতেই পারছিলাম না কী হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত ড্রাইভার দরজা খুললো, প্রায় ৮ মিনিট পর আমরা বাস থেকে বের হলাম। প্রত্যেকে বললো চলো পার্ক দিয়ে বেরিয়ে যাই। কেউ বললো পার্কের (হ্যাগলি পার্ক) মধ্য দিয়ে গেলে সহজ লক্ষ্য হবো আমরা, যদি শুটার আমাদের দেখতে পায় এবং গুলি করে!

পরে আরেকটা বিষয় আমাদের আতঙ্কে ফেললো, যদি ব্যাগ নিয়ে আমাদের দৌড়াতে দেখে পুলিশ উল্টো কিছু করে। ওই সময় আপনাদের তিনজনকে দেখতে পেলাম (ইসাম, উৎপল শুভ্র ও মাজহার উদ্দিন)। ওই সময় বুঝিনি, গত রাতে বুঝলাম আপনারা তিনজন কতটা ঝুঁকি নিয়েছিলেন। পৃথিবীর খুব কম লোকই ওই সময় ঝুঁকি নিতো। আমার মনে হয় না খুব কাছের লোকও ওই পরিস্থিতিতে আপনাদের মতো এতটা করতো আমাদের জন্য। আপনাদের দেখে সত্যিই স্বস্তি ফিরে পেলাম আমি। তারপর আমরা সবাই হাঁটা শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর আমরা নিরাপদ দূরত্বে চলে গেলাম, তারপর সবাই মাঠের (হ্যাগলি ওভাল) দিকে দৌড়ালাম।

আপনি বুঝে দেখুন, নিজ চোখে কয়েকজনকে লাশ হতে দেখলেন। আপনার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো। এটা এমন ঘটনা, যা কখনও ভুলবো না আমরা। এটা এমন ঘটনা, যা যত সময় পার হচ্ছে, ততই দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সতীর্থদের অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি এবং প্রত্যেকে এটা নিয়ে কথা বলছে। ভালো ব্যাপার হলো, প্রত্যেকের মুখে এখনও কিছুটা হাসি লেগে আছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ভেতরে ভেতরে সবাই বিধ্বস্ত।

আমরা টিম হোটেলে ফিরলাম এবং সোজা চলে গেলাম রিয়াদ ভাইয়ের রুমে। শুটারের ভিডিও আমরা দেখলাম। খেলোয়াড়রা কাঁদতে শুরু করলো, অনেক সময় ড্রেসিংরুমে যেভাবে কাঁদি আমরা।

একটা ব্যাপার নিশ্চিত ইসাম ভাই, এই মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। আশা করি পরিবারের সবাই আমাদের সহায়তা করবে। আমাদের কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন হবে। আমি চোখ বন্ধ করলেই ওই দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। গতরাতে অনেকে একসঙ্গে ঘুমিয়েছে। আমি, মিরাজ (মেহেদী হাসান) ও সোহেল (মেসিয়ার) ভাই এক ঘরে ঘুমিয়েছি। আমি স্বপ্নে দেখলাম, কয়েকজন লোক বাইকে চড়ে গুলি করছে।

বিমানবন্দরে আসার পথে আমরা সবাই একে অন্যকে বলছিলাম- আরেকটু হলেই ভয়ঙ্কর কিছু হতো; হয়তো আমরা নয়, দেশে ফিরতো আমাদের লাশ। এটা ছিল মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যাপার।’

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?