শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ,২০১৯

Bangla Version
  
SHARE

রবিবার, ০৬ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০২:৪০

শহুরে জীবনে কিভাবে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে প্রাণীরা

শহুরে জীবনে কিভাবে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে প্রাণীরা

ঢাকা: কয়েক হাজার বছর ধরে জাপানি শহর সেন্দাইতে কাক সম্প্রদায়কে তাদের প্রিয় একটি খাদ্য আখরোট খাওয়ার ক্ষেত্রে এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছিল।

যেহেতু এই বাদামের খোসা ছাড়ানো তাদের জন্য খুবই কঠিন, তাই এই পাখিরা খাবারটিকে অনেক ওপরে নিয়ে যেত এবং আকাশ থেকে বাদামগুলো নিচে ফেলে দিতো। খবর বিবিসি বাংলার

১৯৭০ সালে স্থানীয় একজন বিজ্ঞানী দেখলেন যে, এই প্রাণীটি তাদের কৌশল বদলে ফেলেছে। তারা এই বাদামগুলোকে রাস্তার মাঝখানে এমন জায়গায় ফেলতে শুরু করলো, যেখানে সেগুলোর ওপর দিয়ে যানবাহন চলে যেতে পারে-যাতে করে বাদামের গায়ের শক্ত আবরণ ভেঙে গিয়ে তা খাওয়ার জন্য উন্মুক্ত হয়।।

পাখিগুলি গাড়িগুলোকে ব্যবহার করতো বাদাম ভাঙার উপকরণ হিসেবে।

কিভাবে নগরায়ন পশু-প্রাণীর আচার-আচরণ বদলে দেয় এবং খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা তরান্বিত করে (যা করতে অন্যদের মিলিয়ন মিলিয়ন বছর লেগে যায়)- সে বিষয়ে গবেষণার অনন্য কেস স্টাডি হয়ে উঠলো সেন্দাই এলাকার কাকগুলো।

শহুরে জীবনে খাপ খাওয়ানো
২০১৮ সালের জাতিসংঘের খতিয়ান অনুসারে, আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এখন শহরে বসবাস করছে-যা বিশ্বের জনসংখ্যার ৫৫%, এবং তা ১৯৬০ সাল থেকে ৩৪% বেড়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ আমাদের প্রায় ৭০% মানুষই হবে শহরের বাসিন্দা।

আর এই বৃদ্ধির হার বন্যপ্রাণী এবং জীব-বৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কারণ তাদের বাসস্থান কমে গেছে।

তবে বিষয়টি বেশকিছু প্রজাতির মধ্যে পরিবর্তনের সূচনা করেছে, যারা দ্রুত শহুরে জীবনে বেঁচে থাকার কৌশল আয়ত্ত করে ফেলেছে।

ডাচ জীববিজ্ঞানী মেন্নো স্কিলথুইযেন এর ব্যাখ্যা অনুসারে, বন্যপ্রাণীর জীবনের সাথে নগরায়নের সম্পর্ক অনুধাবন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন আমরা এমন এক অবস্থার দিকে যাচ্ছি যেখানে অধিকাংশ মানুষ যে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকবে তা হল নগর-প্রকৃতি। আমাদের আরও নিশ্চিত করারতে হবে যে, নগর প্রকৃতিকে যতটা সম্ভব সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে হবে।

দ্রুতগতিতে পরিবর্তন
স্কিলথুইযেন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের যুক্তি যে, কিছু কিছু বিষয় মানব-সৃষ্ট দ্রুত বিবর্তনমূলক পরিবর্তনের উদাহরণ - একটি দ্রুত অভিযোজন যা শতাব্দীর মাঝে হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তার পরিবর্তে কয়েক দশক বা এমনকি কয়েক বছরের মধ্যে ঘটতে পারে।

ব্রিজ স্পাইডার যা সাধারণত আলো এড়িয়ে চলে, তারা নিজেদের জাল তৈরির জন্য পরিবর্তিত হয়ে মথ-আকর্ষণ করে এমন সড়কবাতির কাছে যায় জীবনের তাগিদে। অনেক শহরে, মথ বাল্বের আলোর হাতছানিতে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। ডারউইন কামস টু টাউন গ্রন্থে ডাচ জীববিজ্ঞানী এমনটাই লিখেছেন।

আচরণগত এই ধরনের পরিবর্তনগুলো বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সহজেই লক্ষ্য করা যায় এবং শহরগুলোতে তা চাক্ষুষ করার সেরা জায়গা।

ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টোর জীববিজ্ঞানী মার্ক জনসন বলেছেন, সর্বোত্তম এবং বৃহৎ-পরিসরে অনিচ্ছাকৃত বিবর্তন অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে নগরায়ন।

নাগরিক অভিযোজনের বিষয়ে ১৯২টি গবেষণা-পরীক্ষা নিয়ে ২০১৭ সালে প্রকাশিত বিজ্ঞান জার্নালে জনসন ছিলেন সহ-লেখক।

এতে দেখা যায় যে, প্রজাতিগুলি শহুরে পরিবেশের মধ্যে স্বস্তির জায়গা খুঁজে বের করে যা তাদের সঠিকভাবে বিকশিত করে।

অন্যতম উদাহরণ হল, পেরেগ্রিন ফ্যালকন-এই শিকারি বাজ পাখিটি বিংশ শতকের মধ্যভাগে অনেক জায়গায় বিলুপ্ত হওয়ার হুমকিতে পড়েছিল রাসায়নিক কীটনাশকের কারণে।

ফ্যালকন বা বাজপাখিরা যেহেতু অতিথি পাখি শিকার করতো, ফলে তাদের শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশক প্রবেশ করতো (ডিডিটি নামক কীটনাশক), কারণ অতিথি পাখিরা পোকামাকড় খেত।

ডিডিটি কীটনাশকের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং প্রজনন কর্মসূচি এই প্রজাতিটিকে ফিরিয়ে আনার কাজ করেছে।

এই বাজপাখিগুলি গ্রামীণ আবাস ফেলে রেখে শহরে শহরে চলে গেল, যেখান তারা আকাশচুম্বী ভবন এবং উঁচু উঁচু অবকাঠামোগুলোতে বাসা বানানো রপ্ত করে ফেলে। কারণ বাসস্থানের সংকট তাদের ওপর চরম চাপ তৈরি করেছিল।

তাদের শিকার প্রাপ্তির সহজলভ্যতার দিকেও নির্ভর করতে হয়েছিল: গবেষকদের লিপিবদ্ধ তথ্য অনুসারে, ফ্যালকন শহরের অন্যান্য প্রাণীর খাবারে ভাগ বসাতো, তা হোক কবুতর থেকে বাদুড়।

লম্বা এবং পুরুসূঁচালো ঠোঁট
জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে ডারউইনের ফিঞ্চ পাখির একটি পাকাপোক্ত অবস্থান আছে। যদিও তা সরাসরি সত্যিকার ফিঞ্চপাখির সাথে জড়িত নয়, সেগুলো ছিল গ্যালাপাগোস আইল্যান্ডের একধরনের প্রজাতি। সেগুলো তার ‘ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচন’ (বিবর্তনবাদের তত্ত্ব) তত্ত্বের উদ্ভাবনে বিশেষ সহায়তা করেছে।

এই পাখিগুলির ঠোঁটের আকার এবং গঠন ছিল বিভিন্ন রকম, এবং বিভিন্ন দ্বীপ থেকে নির্দিষ্ট খাবার বেছে নিতো তারা।

কিন্তু সাম্প্রতিককালে টাকসন, অ্যারিজোনার ফিঞ্চ পাখির প্রজাতি বিজ্ঞানীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে: তাদের ঠোঁট এখন তাদের গ্রামীণ প্রজাতির থেকে লম্বা এবং চওড়া ।

এই আকার সূর্যমুখী ফুলে বীজ খাওয়া সহজ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মিউজিয়াম অব সাউথওয়েস্টার্ন বায়োলজির পরিচালক এবং সংরক্ষক ক্রিস্টোফার উইচ বলেন, আমি মনে করি এটা খুব শক্তিশালী প্রমাণ যে যখন আমরা বণ্য প্রজাতির সম্পর্কে কোন নতুন তথ্যসরবরাহ করি, আমরা বিবর্তনবাদের সাথে মিলিয়ে ফেলি।

ভূ-গর্ভস্থ মশা
কিউলেক্স পাইপেনস এক ধরনের মশা যা বিশ্বজুড়ে দেখা যায়। তারা খুব সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে বলে পরিচিত। কিন্তু লন্ডনের ভূ-গর্ভস্থ মশা বিষয়টিকে আরও একধাপ সামনে নিয়ে গেছে।

যেখানে কিউলেক্স পাইপেন্স মশা মাটির ওপরে বসবাস করে, অনেক সঙ্গী বানায়, কিন্তু কিউলেক্স মলেস্টাস থাকে মানব-নির্মিত এলাকা এবং ভূগর্ভস্থ জায়গাগুলোতে। এটি একজন সঙ্গীর সাথে মিলন ঘটায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হল, যেখানে কিউলেক্স পাইপেন্স পাখিদের কামড়াতে পছন্দ করে , কিউলেক্স মলেস্টাস মানুষের রক্তের স্বাদ গ্রহণে তৈরি হয়ে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যেসমস্ত মানুষ ব্রিটেনের রাজধানীর বিখ্যাত পরিবহন টানেল নিরাপত্তা শেল্টার হিসেবে ব্যবহার করতেন তাদের এই মশার মারাত্মকভাবে কামড়ানোর ইতিহাস রয়েছে।

কিউলেক্স মলেস্টাস ভূ-গর্ভস্থ অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল ।

কিন্তু মানবদেহের রক্তের প্রতি তার তীব্র আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও লন্ডনের ভূ-গর্ভস্থ মশা বর্তমান ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ব্যবহারকারীর অভিযোগের তালিকায় ততটা স্পষ্ট অবস্থানে নেই।

বিস্টন বেতুলারিয়া মানুষের দ্বারা প্রভাবিত অভিযোজনের আরেকটি উদাহরণ। ব্রিটেনে শিল্পায়নের দশকগুলোতে এটি নগর জীবনে ছড়িয়ে পড়ে। চিমনি থেকে নির্গত কালিঝুলি তাদের শিকারিদের চোখ থেকে লুকাতে সাহায্য করেছিল, কেউ কেউ গাছের আড়ালে লুকাতো, ধরা পড়ে যেত এবং তাদের জনসংখ্যা এভাবে হ্রাস পেতো।

১৯৬০ এর দশকের উন্নত বায়ু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিবেশে পরিচ্ছন্নতা দেয় এবং হালকা রং এর মথের পুনরাবির্ভাব দেখা যায়।

মেট্রো ব্যাঙ
মেক্সিকো থেকে উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকার গ্রীষ্মমন্ডলীয় বন পর্যন্ত টুঙ্গারা ব্যাঙ বাস করে এবং চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য মোতাবেক তাদের শব্দের দ্বারা তারা নারী সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করে।

তাদের সঙ্গীত শিকারিরাও তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে কাজে লাগায়।

গবেষকরা দেখেছেন যে, যেসব ব্যাঙ শহুরে পরিবেশে বসবাস করে তারা নারী সঙ্গিনীদের আকৃষ্ট করতে গ্রামে বসবাসকারী ব্যাঙ এর চেয়ে আরও জটিল ডাক তৈরি করে। একইসময় 'মেট্রো ফ্রগ' বা 'শহুরে ব্যাঙ'দের নাগরিক পরিবেশে শিকারিদের বিষয়ে কম উদ্বিগ্ন হলেও চলে।

রাতের আঁধারে ব্লাকবার্ড এর গান
সাধারণ প্রজাতির ব্ল্যাকবার্ড (টুর্ডুস মেরুলা) বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন একটি শহুরে প্রাণী। গ্রামীণ এলাকা বা উপশহরে বসবাসকারীদের তুলনায় শহুরে এলাকায় বসবাস এসব প্রাণীর জীবনে নানারকম পরিবর্তন এনেছে।

গবেষক মেন্নো স্কিলথুইযেনের মতে, ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকাতে তাদের সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি হিসেবে বিবর্তন হচ্ছে।

তিনি লেখেন, এটা জানা দরকার যে, গবেষণাগারে বনের এবং শহুরে ব্ল্যাকবার্ডের অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে যাদেরকে ছানা হিসেবে ঠিক একই পরিস্থিতিতে লালন-পালন করা হয়েছিল। সুতরাং তারা প্রকৃতিগতভাবে আলাদা ছিল, জীবনের পদ্ধতিগতভাবে নয়।

এইসব শহুরে পাখি লম্বায় খাটো, ছোটা এবং পুরু ঠোঁট, শীতের সময় অভিবাসী হতে দেখা যায় না। শব্দদূষণ তাদের গান গাওয়ার সময়ও বদলে দেয়।

বনের পাখীদের ভোরবেলা সঙ্গীতের কলকাকলির জন্য মুখরিত। শহুরে পাখিদের সূর্যোদয়ে ঘণ্টা-খানেক আগে গাইতে শোনার কথা জানা বিজ্ঞানীরা।

পুয়ের্তোরিকোর অ্যানল লিযার্ড নাগরিক অভিযোজনের পোস্টারবয় হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন। পাথর এবং গাছপালা বেষ্টিত পরিবেশ থেকে এসে বাসিন্দারা শহরের দেয়াল এবং জানালার মাঝে খাপ খাওয়ানো চ্যালেঞ্জ ছিল।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী ক্রিস্টিন উইনচেল বলেন, শহরাঞ্চল অন্য আরেক পরিবেশ। সেখানে বসবাসকারী প্রাণীরা কোনভাবেই প্রাকৃতিক সিলেকশনের বিরোধী নয়।

তিনি আরও জানান, শহুরে বসবাসকারী প্রাণীগুলোর পায়ের আঙ্গুলগুলোতে বেশি বেশি লোম থাকে এবং পায়ের পাতা তুলতুলে থাকে। শহরের এবং গ্রামীণ এলাকার গিরগিটির চিত্র-ধারণ করে উইনচেল দেখিয়েছেন যে, পিচ্ছিল ভূ-পৃষ্ঠে শহুরে বাসিন্দা স্বচ্ছন্দে হেটে ছাড়িয়ে গেছে।

তার ভাষায়, এটা আশ্চর্যের বিষয় যে, এই গিরগিটিগুলো কীভাবে আবাসের সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের উপস্থিতির সাথে লড়াই করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে তারা এমনকি উচ্চ তাপমাত্রায় আরও সহনশীল হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে এইসব প্রাণীর অভিযোজন ক্ষমতাকে খাটো করে দেখাটা হবে ভুল।

এটা এমন নয় যে কোনও প্রজাতি যে বিলুপ্তির হুমকিতে নেই তার অবস্থার শিগগিরই বা বিলম্বে অবস্থার পরিবর্তন হবেনা। এমনকি সাধারণ প্রাণীও বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা দেখা যেতে পারে যদি আমরা নিশ্চিত করতে না পারি যে, শহর-নগরের বিকাশও বন্যপ্রাণীর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?