শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ২৫ মে, ২০১৮, ০৭:২৩:৪৯

তরুণীরা ঝুঁকছে সিসায়

তরুণীরা ঝুঁকছে সিসায়

ঢাকা: মাদকের সহজলভ্যতা ও জ্যামিতিকহারে বৃদ্ধি পাওয়া মাদকসেবীর সংখ্যা বাড়ছে। ব্যক্তি উদ্যোগে বাড়ছে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। প্রায় একযুগ ধরে মাদক নিরাময়ের জন্য একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও বিগত দুই বছরের ব্যবধানে তা বৃদ্ধি হয়ে দাড়িয়েছে তিনটি প্রতিষ্ঠানে। প্রশাসন থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে আরও দুটি প্রতিষ্ঠান শীঘ্রই অনুমতি পাবে। অর্থাৎ বিগত দশ বছরেও যতটা মাদকাসক্তের পরিমাণ ছিল তার থেকে গত দুই বছরে বেড়েছে দ্বিগুন।

মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর তথ্য উপাত্ত বলছে, হঠাৎ করে মাদকাসক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে কাজ করছে সহজলভ্যতা। মাদকাসক্তের সাথে কাউন্সিলিংয়ের সময়ে নিরাময় কেন্দ্রের কাউন্সিলররা জেনেছেন, বরিশাল নগরীর প্রতিটি পয়েন্টে সহজেই মাদকদ্রব্য পাচ্ছে সেবীরা। ওদিকে নগরীতে এত পরিমাণ নারী মাদকাসক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যে কারণে নারীদের জন্য আলাদা অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন হলিকেয়ার। এ তথ্য জানিয়েছেন, হলিকেয়ারের ইনচার্জ মাইনুল হক তমাল। তিনি বলেন, প্রত্যেক মাসে ৮/১০জন করে নারী মাদকাসক্তকে নিয়ে আসেন তাদের অভিভাবকগণ।

নাম পরিচয় গোপন রেখে এই মাদকাসক্তের কাউন্সিলিং করেন এই প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি কাজ করছে ক্রিয়া নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ক্রিয়া’র পরিচালক জাহিদ হোসেন জানান, ২০১৭ সালে তার প্রতিষ্ঠানে ৯ জন মারাত্মক মাদকাসক্ত নারীকে নিয়ে আসেন তার পরিবার। বরিশালে নারীদের নিয়ে কেউ কাজ না করায় তাদের ঢাকায় প্রেরণ করেছি। আর চলতি বছরও প্রায়ই নারী মাদকাসক্তর নিয়ে পরামর্শের জন্য অনেকেই আসছেন। যেহেতু বছরের প্রারম্ভিক, সেকারণে পুরো হিসেব করা হয়নি কতজন এখন পর্যন্ত পরামর্শ/সেবা গ্রহণ করেছেন বলে জানান জাহিদ হোসেন।

ওদিকে অপর মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র সেইভ দ্য লাইফ’র স্টাফ শাওন বলেন, অত্যন্ত গোপনে অনেকেই মেয়েদের নিয়ে আসেন। কিন্তু বরিশালে নারী মাদকাসক্তের নিয়ে কাজ করছে না কোন প্রতিষ্ঠান; সেকারণে তাদের ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি। কি পরিমাণ আসে? এমন প্রশ্নের জবাবে শাওন বলেন, যেহেতু আমরা নারী মাদকাসক্তদের নিয়ে কাজ করি না সে কারণে ওসবের হিসেবও রাখি না। তবে আনুমানিক মাসে ৫/৬জন এসে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে বরিশাল নগরীতে ভয়াবহ রকমের নারী মাদকাসক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বয়সের হিসেবে এসব নারীরা কিশোরী অবস্থায় থেকে কৌতুহলবশত আসক্ত হয়ে পড়েন। শেষে যা আত্মহত্যা পর্যন্ত গড়ায়। বরিশাল সদর রোডের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সিগারেট বিক্রেতার সাথে কথা হয়। বিক্রেতারা জানান, স্কুল ও কলেজের ছাত্রীরা প্রচুর সিগারেট ক্রয় করে তাদের দোকান থেকে। দৈনিক হিসেবে যা প্রতিটি দোকান থেকে কমপক্ষে ৫/৭ প্যাকেট। এরমধ্যে মনির নামক এক দোকানী জানান, তিনি চারজন কলেজছাত্রীকে চেনেন যারা নিয়মিত দুই ব্রান্ডের সিগারেট তার কাছ থেকে ক্রয় করেন। এরমধ্যে একটি ব্যান্ড ‘ইজিলাইট’ ও অপর ব্রান্ড ‘হলিউড/শেখ’।

মনির বলেন, ইজিলাইট সচারচার সেবন করলেও হলিউড/শেখ ক্রয় করেন ইয়াবা সেবনের জন্য। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদকাসক্তের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। এরপরেই রয়েছে ডিভোর্সি বা ভগ্ন পরিবারের নারী। তৃতীয় স্থানে রয়েছে প্রেম প্রত্যাখ্যাত। আর চতুর্থ স্থানে রয়েছে যাদের পরিবার মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত বা অভিভাবকরা মাদকাসক্ত। জানা গেছে, বরিশাল নগরীতে নারী মাদকসেবীরা প্রকাশ্যে মাদক গ্রহণ করতে না পারলেও বিশ্বস্ত স্থান বিশেষে থেমে থাকে না তাদের সেবন। ইয়াবা আসক্তিতে জড়িয়ে পড়া সরকারি ব্রজমোহন কলেজের মাস্টার্সের ছাত্রী রিমার (নিরাপত্তার স্বার্থে প্রকৃত নাম ব্যবহার করা হয়নি) সাথে কথা হয়।

তিনি জানান, ছাত্রীরা ইয়াবা ও মরফিন ইঞ্জেকশন বেশি গ্রহণ করে থাকে। এর কারণ হিসেবে ওই ছাত্রী বলেন, এই দুটি গ্রহণের কোন প্রমাণ থাকে না। ইয়াবা সেবনে কিছুটা ঘ্রান হলেও তা বাজে ঘ্রাণ না হওয়ায় কেউ অনুমান পারে না। রিমা জানান, কলেজের মেয়েরা ছাত্রীহোস্টেলে এসব সেবন বেশি করে থাকে। তিনি বলেন, বিএম কলেজের বনমালী গাঙ্গুলী ছাত্রীনিবাসে মাদক সেবন ওপেন সিক্রেট। শুধুমাত্র বনমালী গাঙ্গুলী ছাত্রীনিবাস নয়, ছাত্রীদের জন্য যতগুলো মেস রয়েছে সেখানে প্রায়ই এসব আড্ডা হয়ে থাকে বলে জানান রিমা।

ওদিকে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রী মেস বা ছাত্রী নিবাস ছাড়া কয়েকটি আবাসিক হোটেলে ঘন্টাপ্রতি কক্ষ ভাড়া নিয়ে ইয়াবা সেবনের আসর বসায় তরুণীরা। যদিও এই আয়োজনের অধিকাংশ করে থাকে ছেলে বন্ধুরা। তেমনি একটি হোটেলের সাবেক ম্যানেজার আ. আজিজ বলেন, প্রতি সপ্তাহে তিন-চারটি আড্ডা জমে। এই ব্যবসায়ী বলেন, নগরীর ধনাঢ্য পরিবারের মেয়েদের দেখেছি বন্ধুদের সাথে এসে রুম ভাড়া নিয়ে ইয়াবা সেবন করতে।

সূত্রমতে, নগরীতে সুনির্দিষ্টভাবে ৪টি আবাসিক হোটেল ছাত্রীদের ইয়াবা সেবনের জন্য কক্ষ ভাড়া প্রদান করেন। যদিও বর্তমানে মাদকবিরোধী অভিযান কঠোর হওয়ায় তা স্বীকার করেনি হোটেল কর্তৃপক্ষ। মাদকসেবীদের বরাত দিয়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের কাউন্সিলররা জানিয়েছেন, মাদক সেবনের প্রাথমিক অবস্থাটা শুরু হয় বন্ধু-বান্ধবীদের আড্ডা ও মাদকের প্রতি কৌতুহল থেকে। প্রাথমিক ধাপে সিগারেট সেবন করলেও পরে ছেলে বন্ধুরা সেক্সুয়াল সর্ম্পক স্থাপনের জন্য ইয়াবা সেবন বা মারাত্মক আসক্তির মাদকদ্রব্যের জোগান দিয়ে মেয়ে বন্ধুদের কৌতুহল মেটায়।

এভাবে একপর্যায়ে আসক্তিতে পৌছায়। ক্রিয়া’র পরিচালক জাহিদ হাসান বলেন, এছাড়াও পারিবারিকভাবে হতাশা, পরিবেশও মাদকাসক্তির কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, মূলত ২০-২৮ বছর বয়সের মধ্যে ছেলেরা ও ১৭ থেকে ২৪ বছর বয়সে মেয়েরা যেকোন মাধ্যমে আসক্তিতে জড়ায়। এই সময়টা অভিভাবকদের সুনজর ও বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করা উচিত সন্তানদের সাথে।

জানা গেছে, প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে একটি করে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থাকার কথা। সে অনুসারে ঢাকা, চট্রগ্রাম ও খুলনায় থাকলেও বরিশালে তা নেই। জাতিসংঘের হিসেব বলছে পুরুষ মাদকাসক্তের সাথে পাল্লা দিয়ে নারী মাদকাসক্তর সংখ্যা বাড়ছে। যা বিশ্বে বর্তমানে ৭০ লাখ। যার মধ্যে ৩০ ভাগ নারী। আর বাংলাদেশে মোট মাদকাসক্তের ১৩ ভাগ নারী। ওদিকে বর্তমানে বরিশালে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে আটককৃতদের একটি বৃহদাংশ নারী ব্যবসায়ী। আর ২০১৭ সালে অর্ধশতাধিক নারীকে বরিশাল আদালত থেকে সাজা দেওয়া হয়েছে।

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

 



আজকের প্রশ্ন