শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ,২০১৯

Bangla Version
  
SHARE

মঙ্গলবার, ২৯ মে, ২০১৮, ১০:২৬:১৫

খুলনায় বোরো ধান এবার কৃষকের গলার কাঁটা

খুলনায় বোরো ধান এবার কৃষকের গলার কাঁটা

খুলনা: ডুমুরিয়া উপজেলার শোভনা ইউনিয়নের কাঁকমারী বিলে পাঁচ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন মো: হাবিবুর রহমান মোড়ল। ধানের ফলনও হয়েছে বেশ। পাঁচ বিঘা জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ১৫০ মণ। ধানের আবাদে বীজতলা তৈরি, রোপন, সার, কীটনাশক দেয়া, ধান কাটা ও মাড়াইসহ অন্যান্য খরচ হয়েছে বিঘাপ্রতি ১৩ হাজার টাকা। বর্তমানে ধানের বাজার মূল্য অনুপাতে হাবিবুর রহমানের লোকসান হবে বিঘাপ্রতি দুই হাজার টাকা।
 
ধানকাটা মৌসুমের শুরুতে বাজার দর কিছুটা হলেও ভালো থাকায় চাষিরা আশার আলো দেখতে শুরু করেন। কিন্তু সে আশার আলো দেখতে না দেখতেই হঠাৎ করেই ম্লান হয়ে পড়েছে। ধানকাটার শেষ পর্যায়ে ধার দেনা শোধ, ব্যাংক ঋণ, জমির হারি দিতে গিয়ে অর্থ  সঙ্কটে পড়েছেন তারা। ধানের ব্যাপক ফলন হয়েছে। কিন্তু বাজার মূল্য না পাওয়ায় হতাশ কৃষকেরা। তাছাড়া ধান রাখার মত পর্যাপ্ত জায়গা অনেকের নেই। তারা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি সমস্যায়।
 
এদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন বর্গাচাষীরা। লোকসানের বোঝা কাঁধে পড়ায় সোনালি হাসির পরিবর্তে চরম হতাশায় চাষিরা।
 
মাগুরখালী ইউনিয়নের মাগুরখালী গ্রামের মনোজ কুমার সরকার অন্যান্য বছর বোরো ধানের দাম দেখে এবার ৪৫ বিঘাজমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নোনায় ভূমি তেঁতে যাওয়াসহ নানা কারণে ধানের ফলন তেমন হয়নি। বিঘা প্রতি ধানের উৎপাদন হয়েছে ২০ মনের মত। খরচ হয়েছে বিঘাপ্রতি ১৩ হাজার টাকা। এক বিঘা জমির ধান বিক্রি করে ( প্রতিমণ ৬০০ টাকা) পেয়েছেন ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ তার প্রতিবিঘা জমিতে লোকসান গুনতে হয়েছে এক হাজার টাকা।
 
গুটুদিয়া ইউনিয়নের গুটুদিয়া গ্রামের নিখিল চন্দ্র মন্ডল তিন বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করে ধান পেয়েছেন ৯০ মণ। তার খরচ পড়েছে ৪০ হাজার টাকার মত। তিনি ধানের দাম কম হওয়ায় ধান বিক্রি করতে পারছেন না। নিখিল মন্ডল বলেন, ভেবেছিলাম সরকার ধান কিনব। গত বছর ধানের মূল্য ছিল ১০৫০ টাকা মণ। এবার সেই ধানের মণ ৬০০ টাকা থেকে সাড়ে ৬ শত টাকা। নিখিল মন্ডল ধান বাড়িতে বস্তা ভরে রেখে দিয়েছেন, দাম বাড়লে তবেই বিক্রি করবেন। ধান বিক্রি করে জমির মালিককে হারি দিতে হবে। তিনবিঘা জমির হারি ৪৫ হাজার টাকা।
 
দিন-রাত হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফলে কৃষকের ঘরে গোলা ভরা ধান আসে। কিন্তু এবার  তারা শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। অনেক কষ্টে সৃষ্টে ফসল ফলালেও তা ঘরে তুলতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে খুলনার বোরো চাষীদের। কারণ বাড়তি পারিশ্রমিক দিয়েও মেলানো সম্ভব হচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত শ্রমিক। আর এর ফলে নিজ হাতে ফলানো সোনার ফসলকে অনেক কৃষকই গলার কাঁটা মনে করছেন।
 
এদিকে সরকার চলতি মে মাসের ২ তারিখ হতে বোরো মৌসুমে সারাদেশে ধান ও চাল সংগ্রহ শুরু করেছে। খুলনায় শুধুমাত্র মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে। অন্যান্য বছর চাষীর কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হত। তাতে চাষীরা ধানের ন্যায্যমূল্য পেত। তাছাড়া বাজারেও ধানের চাহিদা থাকত। কিন্তু এবার মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করার সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন মাঠ পর্যায়ের চাষিরা।
ফলে মজুদদার, দালাল, ফড়িয়ারা সিন্ডিকেট করে কম দামে ধান কিনছে বলে কৃষকদের সাথে আলামকালে জানা গেছে।
 
ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা জানান, সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান না কিনে মিল চাতাল ও বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উৎকোচের মাধ্যমে চাল কিনে ফলে ব্যবসায়ীরা ওই ব্যবসায়ীরা নাম মাত্র দামে কৃষকদের ধান বিক্রি করার পরিস্থিতি তৈরী করেছে।
 
বোরো আবাদের শুরুতে এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ও পোকার আক্রমণ না হওয়ার কারণে এ বছর বেরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। আনন্দ উৎসবের মধ্যে দিয়ে বোরো ধান কাটা শুরু হয়। কিন্তু সরকার নির্ধারিত মূল্য তাদের ভাগ্যে জুটছে না। বর্তমানে এখানে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০-৬২০ টাকা দরে।
 
খুলনা জেলার এবার খাদ্য বিভাগ মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল  কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ধান কাটা ও মাড়াইয়ের সময়ে বৃষ্টি হওয়া এবং ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খুলনার ধানের মান খারাপ হয়েছে এমন অজুহাতে ধান কেনা হচ্ছে না। যে কারণে চাল সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে খাদ্য বিভাগ। এ সুযোগে মিল মালিকরা তাদের গুদামজাত করে রাখা বা পুরনো চাল গছিয়ে দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তাছাড়া সরকারি বরাদ্দের বিভিন্ন কর্মসূচির চাল অনেকেই কম দামে কিনে রেখেছে তারা এ সুযোগে বেশি দামে বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছে।
 
ডুমুরিয়া উপজেলার নুর অটো রাইসমিলের মালিক শেখ লতিফুর রহমান জানান তিনি সরকারি খাদ্য বিভাগে ২৪ মেট্রিক টন চাল দেয়ার অনুমতি পেয়েছেন। এজন্য কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হচ্ছে। দুই একদির মধ্যে চাল দেয়া হবে।
 
খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বরত কর্মকর্তা মো: নুর আলম জানান, খুলনায় এবার সরকারিভাবে আট হাজার ৬০৪ মেট্রিক টন চাল কেনা হবে। ইতিমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে তিন হাজার ৬২২ মেট্রেক টন। প্রতিটন মোটা সিদ্ধ-এর দাম ৩৮ হাজার টাকা ও আতপ প্রতিটন ৩৭ হাজার টাকা।
 
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, খুলনা জেলায় বোরো মৌসুমে ধানের আবাদ হয়েছিল ৫৮ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমি (১ হেক্টর = ২.৪৭ একর)। উৎপাদন হয়েছে তিন লাখ ৮৪ হাজার ২৭১ মেট্রিক টন ধান। যা থেকে চাল পাওয়া যাবে দুই লাখ ৫৬ হাজার ১৮১ মেট্রিক টন চাল।
 
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো: নজরুল ইসলাম বলেন, ডুমুরিয়ায় এবার ২১ হাজার ৮৪০ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৪৭ হাজার ৭৯৬ মেট্রিক টন ধান। এবার ধানের বাম্পার ফলন হলেও বাজার মন্দা থাকায় কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। তিনি বলেন, এবার এখন পর্যন্ত কৃষকের কাছ থেকে সরকার ধান ক্রয় করছে না। তবে মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করছে।
 
খুলনা জেলা প্রশাসক মো: আমিন উল আহসান বলেন, সরকার খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে বোরো মৌসুমে এবার চাল সংগ্রহ শুরু করেছে। মে মাসের ২ তারিখ থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এ অভিযান চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
 



আজকের প্রশ্ন