বুধবার, ০১ এপ্রিল ,২০২০

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:২৩:০৩

ইরানে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত ২৩ দর্শনীয় স্থান

ইরানে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত ২৩ দর্শনীয় স্থান

পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর, আকর্ষণীয়, মনমুগ্ধকর, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও দর্শনীয় স্থানে পরিপূর্ণ একটি দেশের নাম ইরান। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো দেশটির মোট ২৩টি স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ইরানের ঐতিহাসিক এসব স্থান ভ্রমণপিপাসু, পর্যটক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে অনন্য স্থান দখল করে নিয়েছে। আজ দর্শনীয় স্থানের শীর্ষে থাকা ইউনেস্কো স্বীকৃত এমনই কিছু শহর সম্পর্কে আমরা এই লেখাটি থেকে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো। নিচে এই স্থানগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো।

আরমেনিয়ান মনাস্টিক এনস্মেবল অব ইরান: ইরানের পশ্চিম আযারবাইজান ও পূর্ব আযারবাইজান প্রদেশে অবস্থিত ‘আরমেনিয়ান মনাস্টিক এনস্মেবল অব ইরান’। সপ্তম শতকের দিকে সন্ন্যাসী আশ্রমটি গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিক এনস্মেবলটি আরমেনীয়দের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সর্বশেষ প্রামাণ্য সাক্ষ্য। অঞ্চলটিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরেমনীয়রা বসবাস করে এসেছে। মূলত সেন্ট থাডেস, সেন্ট স্টেপানোস এবং চ্যাপেল অব যার্ডযার- এই তিনটি সন্ন্যাসী এনসেম্বল নিয়ে গড়ে ওঠে আরমেনিয়ান মনাস্টিক এনস্মেবল অব ইরান। সেন্ট থাডেস কে যীশু  
খ্রীষ্টের প্রেরিত দূতের সমাধিস্থল বলে ধারণা করা হয়।

বাম নগরীর সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য: ঐতিহ্যবাহী বাম নগরী পূর্ব ইরানের কেরমান প্রদেশে অবস্থিত। এটির সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য মধ্যযুগীয় নির্মাণ ও মরুদ্যানে জীবের অস্তিত্বের প্রাচীন প্রমাণ বহন করে। ভূগর্ভস্থ সেচ খালের কারণে এই অঞলে জীবনযাপন সম্ভব হয়েছিল। খালগুলি নির্মাণ করা হয়েছিল ধারাবাহিকভাবে গড়ে ওঠা দুর্গ ও প্রাসাদের অধীনে। কিছু সেচ খাল বর্তমানে ধ্বংস অবস্থায় রয়েছে। সেসময় বাণিজ্যক বিবেচনায় ভৌগিলভাবে কৌশলগত অবস্থানে ছিল বাম নগরী।  

বিসতুন: বিসতুন হচ্ছে খোদাই ও কিউনিফর্ম শিলালিপির প্রাণকেন্দ্র। পাহাড়ের ঢালে বড় বড় পাথরের ওপর উৎকীর্ণ খোদাই কাজের জন্য সর্বাধিক খ্যাতি লাভ করে স্থানটি। বিশেষজ্ঞরা পাথরের গায়ে খোদাই করা কিউনিফর্ম স্ক্রিপ্টের পাঠোদ্ধারকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫২১ শতকে পারস্য সম্রাজ্যের তৎকালীন শাসক দারিউস প্রথম এর নির্দেশে এটি নির্মাণ করা হয়। তিন ভাষায় লেখা শিলালিপিতে দারিউস শাসকের বিভিন্ন যুদ্ধের বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। দারিউস তার সম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে মূলত এসব যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। এটাই একমাত্র শিলালিপি যেখানে এখনও তৎকালীন সময়ের শিল্প ও লেখনীর বিকাশের অন্তর্দৃষ্টি বিদ্যমান রয়েছে।   

ম্যায়মান্দের সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য: ম্যায়মান্দ উপত্যকা ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত। এলাকাটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শুষ্ক। এই অঞ্চলের মানুষজন মৌসুমী অভিবাসী। আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে তারা উপত্যকার চারদিকে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। ম্যায়মান্দের মনোরম সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য পশুপাখির চেয়ে বেশি স্থানান্তরিত হওয়া মানুষদের অভিবাসন পদ্ধতির একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

গোলেস্তান প্যালেস: ইরানের রাজধানী তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে গোলেস্তান প্যালেসের অবস্থান। এটিও ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত ইরানের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থান। প্রাসাদটি ছিল প্রাচীন কাযার রাজার পারিবারিক বাসভবন। যিনি ১৭৭৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ইরানি ও পশ্চিমা স্থাপত্য শৈলীর অসাধারণ সংমিশ্রনে গোলেস্তান প্যালেস নির্মাণ করা হয়। প্রাসাদটিতে ফুটিয়ে তোলা নব্যশৈলী আজ পর্যন্ত ইরানি শিল্পীদের কাছে প্রেরণা হয়ে রয়েছে।

গনবাদ-ই কাবুস: গনবাদ মূলত ইরানের গোলেস্তান প্রদেশের একটি প্রাচীন শহর, যেটি জোরজান নামে পরিচিত ছিল। গনবাদ-ই কাবুস অর্থ গনবাদের মিনার। অর্থাৎ গনবাদ-ই কাবুস বলতে এখানকার ৫৩ মিটার উঁচু একটি সমাধিস্তম্ভকে বোঝানো হয়। যার রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক মূল্য। শহরটি চতুর্দশ থেকে পঞ্চদশ শতকে মোঙ্গোলীয়দের তাণ্ডবে ধ্বংস হয়ে যায়। গনবাদ-ই কাবুস শহরটির একমাত্র অবশিষ্ট প্রমাণ হিসেবে এখনও মাথা উঁচু করে আছে। ঐতিহাসিক নিদর্শনটি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিকাশমান বিজ্ঞান ও গণিতের প্রতিচ্ছবি।

ঐতিহাসিক ইয়াজদ নগর: ইরানি মালভূমির মধ্যখানে অবস্থিত ঐতিহাসিক ইয়াজদ নগর। মরুর বুকে সীমিত সহায়-সম্পদের মধ্যে জীবন বাজি রেখে বসবাসের প্রসিদ্ধ দৃষ্টান্ত হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে শহরটি। ইয়াজদ শহরে ভূগর্ভস্থ একটি চ্যানেলের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়। ঐতিহ্যবাহী অন্যান্য অনেক মাটির শহরের তুলনায় এখনও ব্যতিক্রমী রূপে সংরক্ষিত রয়েছে। শহরটি এখনও আধুনিকায়ন এড়িয়ে তার ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন ধরে রাখতে সফল হয়েছে।       

মাসজিদ-এ জামে বা ইসফাহানের জামে মসজিদ: মাসজিদ-এ জামে অর্থ জুমার মসজিদ। ঐতিহাসিক ইসফাহান শহরে এটি অবস্থিত। ইরানে চুতষ্কোণীয় আইওয়ান (lwan) স্থাপত্যশৈলীর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। নিদর্শনটি চুতষ্কোণীয় আইওয়ান বিন্যাসকে ফুটিয়ে তুলে নির্মাণ করা প্রথম ইসলামি ভবন। স্থাপনাটি একটি মডেল মসজিদে পরিণত হয়। যার অনুকরণে পরবর্তীতে নির্মাণ করা হয় বহু মসজিদ। এটির উদ্ভাবনী স্থাপত্যশৈলীতে ওই অঞ্চলের ভবন নির্মাতারা উৎসাহিত হয়। বিংশ শতাব্দী জুড়ে মসজিদটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

ইমাম ময়দান, ইসফাহান: ইমাম ময়দান ইসফাহান শহরে অবস্থিত ইরানের একটি স্বতন্ত্র স্কয়ার। সাধারণত ইরানের নগর এনসেম্বলগুলি যে শৈলীতে গড়ে উঠেছে তার চেয়ে এটি ভিন্ন। ইসলামি বিপ্লবের আগে জায়গাটির নাম ছিল ইমাম স্কয়ার বা ময়দান শাহ। ইমাম ময়দান বিশ্বের বৃহত্তম সিটি স্কয়ার এবং ইসলামি ও ইরানি স্থাপত্যের প্রসিদ্ধতম দৃষ্টান্ত। দর্শনীয় স্থানটির সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শনগুলি হচ্ছে- রাজকীয় মসজিদ, শেখ লুতফুল্লাহ মসজিদ, কায়সারিয়েহ চত্বর এবং ১৫ শতকের তৈমুরিদ প্রাসাদ। এ নিদর্শনগুলি ইরানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্তস্বরূপ।

পারসেপোলিশ: প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম স্থাপত্য কমপ্লেক্স পারসেপোলিশ। এটি ইরানের শিরাজ প্রদেশের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। সাংস্কৃতিক স্থানটি বিশাল চুনাপাথরের প্লাটফর্মের ওপর নির্মিত। পারস্যের আথেমেনীয় সম্রাজ্যের (খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ থেকে ৩৩০ অব্দ) প্রধান রাজকীয় বাসস্থান ও অনুষ্ঠান কেন্দ্র ছিল পারসেপোলিশ। পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ অব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট স্থাপনাটি পুড়িয়ে ফেলে এবং সেখানে লুটপাট চালায়। সেসময় পূর্বভূমধ্যসাগর এবং মিশর থেকে শুরু করে সিন্ধু নদী পর্যন্ত অঞ্চল আথেমেনীয় সম্রাজ্যের অধীনে ছিল। পারসেপোলিশ শহরের অবশিষ্ট অংশ সভ্যতার প্রমাণ হিসেবে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শহরের অংশে থাকা জনবসতি প্রমাণ বহন করে- তারাই প্রথম কোনো সংস্কৃতি যারা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে মেনে নিয়েছে। এটি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মিলেমিশে সম্প্রীতির সাথে বসবাসর করার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
 
ফার্স অঞ্চলের সাসানীয় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান: ইরানের ফার্স প্রদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত তিনটি ভৌগোলিক এলাকা, যথা: ফিরুযাবাদ, বিশাপুর ও সারভেস্তানে আটটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে। এগুলি নিয়ে গড়ে ওঠে সাসানীয় সম্রাজ্যের প্রত্নতাত্ত্বিক ভূদৃশ্য। এর সুরক্ষিত অবকাঠামো, রাজপ্রাসাদ এবং নগর পরিকল্পনায় সাসানি শাসনামলের প্রাচীনতম ও নবীনতম স্থাপত্যের নিদর্শন বিদ্যমান যা ২২৪ থেকে ৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত বলে মনে করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ প্রাকৃতিক ভূসংস্থানের যথাযথ ব্যবহারকে প্রতিফলিত করে এবং ওই সময়ে ইসলামি  
স্থাপত্যের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব বিস্তারকারী হাখামানশী ও পার্থিয়ান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রোমান শিল্পকলার প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে।
 
শাহর-ই সোখতেহ : ইরানের একটি হারানো রত্ন শাহর-ই সুখতেহ। ‘শাহর-ই সুখতেহ’ অর্থ হচ্ছে পোড়া শহর। প্রত্নতাত্ত্বিকরা শহুরে গঠন-বিন্যাস, জনসংখ্যা ও পরিকল্পনার দিক দিয়ে এই অঞ্চলটিকে বিশ্বের প্রথম শহর হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। ব্রোঞ্জযুগের এই প্রাচীন ও প্রত্নতাত্ত্বিক শহরটি অবস্থিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশে। এই এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, এটিই হচ্ছে পূর্ব ইরানের প্রথম মানববসতি। ৫ হাজার বছরেরও আগে শহরটি গড়ে ওঠে। যেটি এখন অন্যতম  ঐতিহ্যবাহী স্থান। শাহর-ই সুখতেহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ইরানের সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশে জাহেদানের পথে জাবলের নিকটে অবস্থিত। খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ সালে প্রাচীন এই  
নগরটি নির্মাণ করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে চারটি যুগে মানুষজন এখানে বসবাস করে বলে জানা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেখানকার  বাসিন্দারা স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হন।

আরদাবিলের শেখ সাফি আদ-দ্বীন খানেগাহ এবং শিরিন এনসেম্বল:  ক্ষুদ্র মহাজাগতিক শহর আরদাবিল গড়ে ওঠে সপ্তদশ থেকে অষ্টদশ শতকের মধ্যে। সাংস্কৃতিক এই স্থানটি বিশ্বের প্রসিদ্ধতম সুফি বিশ্বাসের নিদর্শন হয়ে ওঠে। সমাধিক্ষেত্র ও  গম্বুজের সমাহারে গড়ে ওঠা স্থানটি প্রখ্যাত মুসলিম সুফিসাধক শেখ সাফি আদ-দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত। শহরটি সুফি রহস্যবাদের সাতটি স্তরকে সতর্কতার সাথে একত্রে  
ধারণ করে আছে। আরদাবিলের সাংস্কৃতিক নিদর্শনগুলি সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই স্থানটি মধ্যযুগীয় ইসলামি স্থাপত্যের অনন্য চিহ্ন বহন করে। শেখ সাফি  আদ-দ্বীন আরদাবিলে জন্মগ্রহণ করেন এবং তার জন্মস্থানটি এই সমাধিক্ষেত্র ও পুরো কমপ্লেক্সের মাঝেই অবস্থিত।

শুশতার হিস্টোরিক্যাল হাইড্রলিক সিস্টেম: খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে শাসক দারিউস দ্যা গ্রেটের সময় শুশতার হিস্টোরিক্যাল হাইড্রলিক সিস্টেম নির্মাণ করা হয়। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় এটি নিবন্ধিত হয় ২০০৯ সালে। ধারাবাহিক কয়েকটি চানেলের মাধ্যমে শুশতার শহরে পানি সরবরাহে সিস্টেমটি ব্যবহার করা হতো। তৎকালীন সময়ের উল্লেখযোগ্য বিস্ময়কর অর্জন হিসেবে এটি বিবেচিত হয়। বর্তমানে আজকের দিনেও সিস্টেমটি ব্যবহার করা হয়।

ইউনেসকো সিস্টেমটিকে ‘‘মাস্টারপিস অব ক্রেয়েটিভ জিনিয়াস’’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ব্রিজ, ওয়েয়ারস, বাঁধ, কল, পানির ক্যাসকেড, খাল এবং টানেলের  আন্ত:সংযুক্ত একটি সেট নিয়ে হাইড্রলিক সিস্টেম নির্মাণ করা হয়েছে। কমপ্লেক্সটিতে ব্যবহৃত মূল উপাদান হচ্ছে গ্রানাইট, চুনের প্লাস্টার ও মর্টার।

সোলতানিয়াহ: ইরানের যানযান প্রদেশে অবস্থিত সোলতানিয়াহ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত আরেকটি স্থান। এটি তেহরানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। প্রাচীন শহরটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৩০২ থেকে ১৩১২ সালের মধ্যে। এই প্রাচীন শহরের বেশ কয়েকটি স্থাপনা শহরটিতে ইলখানী শাসনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ওলযাইতুর সমাধিক্ষেত্র। সোলতানিয়াহ শহরে অবস্থিত ওলজায়তুর দরগা। প্রাচীন শহরটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে দরগাটি এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নিদর্শনটি পারস্য স্থাপত্য বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। মনোমুগ্ধকর বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি ইরানের ডাবল খোলসের গম্বুজের প্রথম দৃষ্টান্ত হিসেবে  বিবেচিত হয়।   

সুসা: মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল সুসা শহর দক্ষিণ পশ্চিম ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম অব্দের শুরুর দিকে বাণিজ্য, প্রশাসন ও ধর্মীয় বিবেচনায় সুসা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখে। এটি বিশ্বের বৃহত্তর দুই সভ্যতা- মেসোপটেমিয়ান এবং ইরানি মালভূমির মিলন স্থল হয়ে ওঠে। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০ অব্দে সুসা শহরে জনমানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল। নব্যপ্রস্তরযুগীর গ্রাম হিসেবে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন শহরটি অঙ্কিত মৃৎশিল্প সভ্যতার সাথে সম্পর্কিত ছিল। এই স্থানে প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহের মধ্যে আঁকা মৃৎশিল্প ছাড়াও আঁকা সিরামিকের পাত্রও রয়েছে।

তাবরিজের ঐতিহাসিক বাজার কমপ্লেক্স: তাবরিযের ঐতিহাসিক বাজার কমপ্লেক্স অবস্থিত সিল্ক রোডের কৌশলগত পয়েন্টে। তাবরিজ প্রদেশের কেন্দ্রে এই ঐতিহাসিক বাজারটির অবস্থান। এটি কেবল ইরানের নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন ও বৃহৎ বাজারসমূহের অন্যতম। সুগঠিত বাণিজ্যিক সংযোগ ও রুটের কারণে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্থান হিসেবে এটি  পরিণত হয়। দ্বাদশ থেকে অষ্টদশ শতক পর্যন্ত বাজারটি ট্যাক্সের বাইরে ছিল। অনেকগুলো ভবনের আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে এই বাজার কমপ্লেক্সটি গড়ে ওঠে। যার  
কাঠামোগুলো অপেক্ষাকৃত সুসংহত। এই ঐতিহাসিক বাজার নির্মাণের আগে প্রাচীনত্বের কারণে তাবরিয শহরটি ইরানের সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কেন্দ্ররূপে পরিগণিত হতো।

তাখতে সোলায়মান: ইরানের পশ্চিম আযারবাইজান প্রদেশে অবস্থিত এই সাংস্কৃতিক স্থানটি ভূতাত্ত্বিক গুরুত্বের জন্য প্রসিদ্ধ। সাংস্কৃতিক স্থানটি একটি আগ্নেয়গিরির মুখে অবস্থিত। দুর্গটি এই স্থানের  অধিকাংশ এলাকাজুড়ে অবস্থিত। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটিতে সাসানি শাসনামলে নির্মিত জরাথ্রুস্টদের অগ্নিমন্দির রয়েছে। এখানে জরাথ্রুস্টীয় অভয়ারণ্য গড়ে ওঠে ক্রয়োদশ শতকে এবং সাসানি আমলের মন্দিরটি নির্মাণ করা হয় সপ্তম শতকে। আশ্রমটি আগুন ও পানি সংশ্লিষ্ট ধর্মানুষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

চোঘা যানবিল : ঐতিহ্যবাহী স্থানটি দক্ষিণ পশ্চিম ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত। বর্তমানে এ স্থানে প্রাচীন বিশাল স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়- যা ইউনেস্কো কর্তৃক সংরক্ষিত। সেসময় মেসোপোটেমিয়া অঞ্চলের বাইরে হাতে গোনা যে কয়েকটি প্রাচীন ও সুসংরক্ষিত বিশাল স্থাপত্য নিদর্শন ছিল সেগুলোর অন্যতম হলো এই চোঘা যানবিল। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি এলামাইট আমলের (খিস্ট্রপূর্ব ১৪০০ খেকে ১১০০) স্থাপত্য বিকাশের অনন্য দলিল। শহরটি কখনই পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মাণ করা হয়নি। আসিরিয়ার সাম্রাজ্যের হাতে ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত কিছু মানুষ সেখানে বসবাস করতো। এটি পোড়ামাটি এবং কাদামাটি দিয়ে নির্মিত হয়েছিল।

পার্সিয়ান গার্ডেন : পারস্যের ঐতিহ্যগত বাগান ডিজাইন ও স্টাইল ব্যবহারের কারণে পার্সিয়ান গার্ডেন অব ইরান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি গড়ে ওঠেছে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত নয়টি বাগানের সমন্বয়ে। ভারতীয় বাগান ডিজাইন থেকে শুরু করে স্পেনের আন্দালুসিয়ার বাগান ডিজাইন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই বাগানের ডিজাইন তৈরি করা হয়। প্রকৃতপক্ষে স্পেনের আলহামরার বাগানগুলোর সাথে পার্সিয়ান গার্ডেনের ব্যাপক সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। বাগানটি প্রাকৃতিক ও মানব উপাদানকে কাজে লাগিয়ে সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক স্থাপনের বিখ্যাত দৃষ্টান্ত। অত্যাধুনিক সেচ ও অলঙ্করণ ব্যবস্থার কারণে এটি খ্যাতি লাভ করে।  

পার্সিয়ান কানাত : এই সাংস্কৃতিক নিদর্শন ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত ইরানের আরেকটি নিদর্শন। এই নিদর্শনটি হলো একটি স্বল্প ঢালবিশিষ্ট খাল যা একটি কূপ থেকে পানি সরবরাহের জন্য  ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইরানের শুষ্ক অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ১১টি চ্যানেল নিয়ে পার্সিয়ান কানাত পদ্ধতি গড়ে ওঠে। এখান থেকে প্রাপ্ত পানি পানীয় হিসেবে এবং চাষাবাদের  জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি পানি সরবরাহের জন্য ইরানের একটি প্রাচীন পদ্ধতি যা পারসিকদের দ্বারা খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দে আবিষ্কার করা হয়েছিল। বর্তমানেও এই  অঞ্চলের লোকদের টেকসই পানি সরবরাহের জন্য এই পদ্ধতি এখনও চালু রয়েছে। শুষ্ক ও আধা শুকনো অঞ্চলে বসতি গড়ে ওঠার সময় মানুষ যে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি  অর্জন করেছিল এটি তার অসামান্য উদাহরণ।

লূত মরুভূমি: ২০১৬ সালে এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। লূত মরুভূমি ইউনেস্কোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ইরানের দুটি প্রাকৃতিক নিদর্শনের অন্যতম। এই  মরুভূমির সংরক্ষিত এলাকার আয়তন ২.২ মিলিয়ন হেক্টর। এটি দাশ্তে লূত নামেও পরিচিত। এই লবণ মরুভূমি আয়তনের দিক থেকে বিশ্বে ২৫তম। এটি বিশ্বের সবচেয়ে  উত্তপ্ত ও শুষ্ক বালুময় স্থানগুলোর একটি, যার গড় তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

পাসারগাদ: এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত ইরানের অন্যতম স্থান। এটি হাখামানশী সম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো- যা সাইরাস দ্য গ্রেটের নির্দেশে তৈরি করা হয়েছিল। ৫৪৬ খ্রিস্টাব্দে এই রাজধানী গড়ে ওঠে, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সাইরাস দ্য গ্রেটের নিহত হওয়া পর্যন্ত এর নির্মাণকাজ অসমাপ্ত অবস্থায় রয়ে যায়। বর্তমানে পাসারগাদের সাইরাস দ্য গ্রেটের সমাধিক্ষেত্র এই অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এই সমাধিক্ষেত্র পাথর ও মাটি দিয়ে নির্মিত। সূত্র: রেডিও ফারদা।

এই বিভাগের আরও খবর

  বাতাসেও ছড়াতে পারে করোনা!, চিন্তিত মার্কিন গবেষকরা

  কয়েক সপ্তাহেই মারা যাবে কয়েক লাখ, ২ লাখ হতে পারে মার্কিনীরা

  পহেলা বৈশাখের সব কার্যক্রম স্থগিত, প্রজ্ঞাপন জারি

  ৫-৯ এপ্রিল সব আদালতে ছুটি ঘোষণা

  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিশ্ব: জাতিসংঘ

  লাশ পুড়িয়ে ফেলার চেয়ে কবর দেয়া ভালো: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

  করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুন, ইরানের বিরুদ্ধে নয়: ট্রাম্পকে তেহরান

  গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাক্রান্তের সংখ্যা আরো বেড়েছে, মারা গেছে ১ জন

  করোনায় মধ্যবয়সীদের মৃত্যুঝুঁকিও কম নয়: গবেষণা

  করোনায় প্রবাসে ৫৩ বাংলাদেশির মৃত্যু, যুক্তরাষ্ট্রে ৩২

  করোনায় ভারতে ১৩ কোটি মানুষ চাকরিচ্যুত হতে পারে



আজকের প্রশ্ন