বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ,২০২০

Bangla Version
  
SHARE

বুধবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২০, ০৮:৪৩:২৯

উইঘুর মুসলমানদের নিয়ে মুসলিম বিশ্ব নীরব কেন?

উইঘুর মুসলমানদের নিয়ে মুসলিম বিশ্ব নীরব কেন?

ঢাকা : ৯৬ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ১৪৪ কোটি মানুষের দেশ চীন। ২২টি প্রদেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশের নাম শিনজিয়াং। গোটা চীনে ৪০,০০০ মসজিদের মধ্যে ২৫,০০০ মসজিদই শিনজিয়াংয়ে।

আজ এ সব মসজিদ একে একে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে। খিলখিলিয়ে হাসছে মুসলিম বিদ্বেষী জঙ্গি বৌদ্ধ, ইহুদিগোষ্ঠী। কোথায় আরব, কোথায় ওআইসি, কোথায় মুসলিম ইউনিটি? কে দেবে জবাব!

শিনজিয়াং চীনের উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। আয়তন ১৬ লাখ সাড়ে ৪৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। মানে প্রায় ১১টি বাংলাদেশের সমান। শিনজিয়াং আয়তনে চীনের প্রায় ছয় ভাগের একভাগ।

শিনজিয়াংয়ের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে আছে মুসলিম তাজিকিস্তান, কিরঘিজস্তান ও কাজাখস্তান, দক্ষিণ-পশ্চিমে আছে আফগানিস্তান, আছে জম্মু-কাশ্মীর, আছে মঙ্গোলীয়া। প্রদেশটি স্বর্ণ, তেল ও গ্যাসসহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এটিই হচ্ছে কাল। গরিবের সুন্দরী বউ।

বন্যা-খড়া, দুর্যোগের প্রদেশ বা মরুভূমি কিংবা বরফাচ্ছাদিত প্রতিনিয়তই সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার জাতি যদি হতো শিনজিয়াংয়ের অধিবাসীরা তাহলে তাদের নির্মূলের পরিকল্পনা বা নির্যাতনের ভয়াবহতা আমাদের শুনতে হতো না হয়ত।

শিনজিয়াংয়ের হতভাগ্য নাগরিকদের আমরা উইঘুর মুসলমান হিসেবে জানি। তুর্কি বংশোদ্ভূত এবং তুর্কি ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত এই জাতি উইঘুর ভাষায় কথা বলেন, অনেকটা আরবি ভাষাই বলা যায়। ২০০৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, শিনজিয়াংয়ে দেড় কোটি উইঘুর বসবাস করেন।

তারা ছাড়াও কাজাখস্তান,উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান, তুরস্কে ও রাশিয়ায় প্রায় ৪ লাখের মতো উইঘুর মুসলিমের বসবাস। শিনজিয়াং ‘স্বায়ত্তশাসিত’ প্রদেশ। কিন্তু আজ চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের নিষ্ঠুরতম নিয়ন্ত্রণে শাসিত হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলেছে, চীন সরকার গোপনে বহু উইঘুর মুসলিম স্কলারের একপক্ষীয় বিচার করেছে। বিশিষ্ট উইঘুর ব্যক্তিত্বদের গত কয়েক বছরে আটক বা গুম/খুন হয়ে গেছেন শিনজিয়াং হতে। কয়েকজন হলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মো. সালিহ হাজিম, অর্থনীতির বিজ্ঞানী ইলহাম তোকতি, নৃতাত্ত্বিক রাহাইল দাউদ, সঙ্গীতশিল্পী ও বেহালার স্টার আবদুর রহিম হায়াত, ফুটবলার এরফান হিজিমসহ অজানা অনেকে ।

ইউনাইটেড নেশনস হিউম্যান রাইটস বিষয়ক কমিটি ২০১৮ সালের শেষে এক প্রতিবেদনে বলেছে,১০ লাখ উইঘুরকে চীনের ‘সন্ত্রাসবাদ সংশোধন’ সেন্টারগুলোতে আটক রাখা হয়েছে। আর ২০ লাখ মানুষকে ‘রাজনৈতিক ও দীক্ষাদান কেন্দ্রে’ থাকতে ও ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করা হচ্ছে।

অর্থাৎ নারী-শিশু ছাড়া কেউ বাদ নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, যে সব লোকজনের ২৬টি বাইরের দেশে আত্মীয়-স্বজন আছেন তাদের এ সব ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছে।

চীন মনে করেছিল বিশ্ববাসীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সোনা-রুপার খনি সমৃদ্ধ উইঘুর মুসলিম জাতির নিজস্ব মাটি থেকে উৎখাত করে বা তাদের নিজেদের ‘হান’ জাতিতে রূপান্তর করে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণকে আরও নিখুঁত করবে। কিন্তু শত মাইল উপরের সেটেলাইট ক্যামেরাকে ফাঁকি দিতে পারেনি ।

যেখানে ১ দিন আগে ফসলের মাঠ বা খোলা ময়দান দেখা গেছে সেখানে দিনের ব্যবধানে বিশাল বিশাল স্কুলের মতো সেন্টার। কিসের কেন? বিবিসি সাংবাদিক সরেজমিন চলে যায় আসল খবর নিতে। চীনের পুলিশ বাধা দেয়। কোনোভাবেই ভেতরের খবর নিতে দেয় না।

মাইলের পর মাইল লম্বা লম্বা টাইট সিকিউরিটির ভেতর লাখ লাখ মুসলিম তরুণ যুবকদের কি মেরে-কেটে গলিয়ে ফেলা হচ্ছে, ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে, ছেলে-মেয়ে সন্তান বাবা-মা, দাদা-নানা, দাদি-নানি- সব বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে? কি হচ্ছে? জানা ও যাচ্ছে না।

মুসলমানদের বিবিসি, সিএনএন, স্কাইনিউজের মতো কোনো মিডিয়া নেই। আল জাজিরা দেশে দেশে নিষেধ। মাহাথির, এরদোগান ও ইমরান খান মহোদয়গণ বসে একটি চ্যানেল খোলার খবর শোনালেন। ভালো খবর ছিল। এর পর আর কিছু জানা যায়নি।

বিবিসি সাংবাদিক বাঁধা পেরিয়ে নির্যাতন সেন্টারে সরেজমিন গেলে তাকে ‘ওমির’ নামে নির্যাতিত মুসলমানদের মধ্যে একজন বলেছেন, ‘তারা আমাদের ঘুমাতে দেয় না। কয়েক ঘণ্টা ধরে ঝুলিয়ে রেখে পেটানো হয়। কাঠ ও রবারের লাঠি দিয়ে পেটায়। তার দিয়ে বানানো হতো চাবুক। সে চাবুকের আঘাতে আঘাতে আমাদের শরীরের হার গোশত আলগা করা হচ্ছে। সুই শরীরে ফুটানো হতো। প্লাইয়ার দিয়ে তুলে নেয়া হতো নখ। আমার সামনে টেবিলের ওপর এ সব যন্ত্রপাতি রাখা হতো।একটার পর একটার ব্যবহার হয়। এ সময় অন্যরা যে ভয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করত সেটাও আমি শুনতে পেতাম।’

যুক্তরাষ্ট্রে চীনবিষয়ক কংগ্রেসের একটি কমিটির পক্ষ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে শিনজিয়াংয়ে যে সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য।

কিছুদিন আগে মালয়েশিয়া, ইরান, কাতার ও তুরস্ক বসল। কই কুয়ালালামপুর ঘোষণায় উইঘুর নিয়ে জোড়ালো কিছু দেখা গেল না। বাংলাদেশ আর ইন্দোনেশিয়া মিলে প্রায় ৪২ কোটি মুসলমান। কিন্তু এ দুটি দরিদ্র দেশকে কেউ গুনতে চায় না। আমরা কেন লজ্জা পাই না।

ওয়াজের মাঠে আলেমদের হুংকার শুনলে মনে হয় পৃথিবীতে মুসলমানদের মতো শক্তিশালী কেউ নেই। কিন্তু এটি পুকুরের পানির বুদবুদ। ওয়াজ পর্যন্তই। অবশ্যই ওয়াজ হেদায়েতের মাধ্যম। এটি চলবে। কিন্তু এখানের গর্জনের ভ্যালু কম। মাঠের বাইরে এসে দুনিয়ার দিকে তাকান। মুসলমানদের গবেষণা আর আবিষ্কারের যুগে ফিরে যেতেই হবে।

আমরা কেন লোহাকে কাজে লাগিয়ে তথ্য প্রযুক্তিতে শক্তিশালী হই না? পবিত্র কোরআনের ৫৭ নং সূরাটির নাম লোহা।২৫ নং আয়াত।

দেখুন মহান রাব্বুল আলামীনের নির্দেশনা- নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদের প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আমি লৌহও দিয়েছি যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ; এটা এ জন্য যে, আল্লাহ প্রকাশ করে দিবেন কে প্রত্যক্ষ না করেও তাকে ও তার রাসূলদের সাহায্য করে। আল্লাহ সর্বশক্তিমান, পরাক্রমশালী।

লোহাকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন ইউরোপ আজ সুপারপাওয়ার প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী। তারকাটা বানানো ছাড়া মুসলমানগণ লোহাকে কাজে লাগাতে পারেনি।

বাইসাইকেল থেকে সুপারসনিক বা বোয়িং সবই লোহার তৈরি। আমরা বাইসাইকেলে আছি, তারা বোয়িং বানায়। হাত ঘড়ি, মোবাইল থেকে রকেট স্যাটেলাইট সবই লোহায় নির্মিত। তোমরা ঘড়ি বানাও তারা স্যাটেলাইট বানায়।

অস্ত্র অ্যাটমবোম সবই তারা বানিয়ে শক্তিধর। তোমরা নিয়ে পড়ে আছ আসমান আর কবর। আহা মুসলমান! আহারে মুসলমান!! আমাদের যেন হুঁশ হয়।

আলী আবদুল মুনতাকিম

লেখক: কোরআন গবেষক ও টিভি আলোচক

এই বিভাগের আরও খবর



আজকের প্রশ্ন