শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

মঙ্গলবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৭, ০৭:১০:০৬

ও আমার বাংলাদেশ : কাজ করলে বিপদ!

ও আমার বাংলাদেশ : কাজ করলে বিপদ!

নাদীম কাদির    

জীবন বড়ই বিচিত্র। বাবা-মা তাদের সন্তানদের অনেক শিক্ষা দেন মানুষ হওয়ার জন্য। আমিও তার ব্যতিক্রম না, তবে বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে মা ছিলেন আমার সবকিছু। মা, প্রয়াত হাসনা হেনা কাদির, শিক্ষা দিয়েছেন অনেক কিছু। তার মধ্যে ছিল যে, কাজের সময় আমার শতভাগ দিতে হবে কারণ তা না হলে রুজি হালাল হবে না। আরেকটি ছিল সবার সঙ্গে নম্র ব্যবহার করা।

এখন আমার বয়স ৫৭, যদিও অনেকে বলে তার থেকে অনেক কম বয়সী আমাকে মনে হয়। খুব মজা লাগে! আর আমি বলি, একটাই জীবন, সংগ্রাম আনন্দ আর দুঃখ থাকবেই কিন্তু আমি জীবনটাকে সব সময় উপভোগ করি। আর তাই হয়তো আমি এখনো বেঁচে আছি। কারণ ১৯৭১ থেকে জীবনটা খুব সংগ্রামের মধ্যে চলছে।

এর বিশেষ কারণ হলো, আমি যেখানেই গেছি, মায়ের কথা অনুযায়ী সবটুকু দিয়েই কাজ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ভালো কাজ করার ফলে বাহবা না পেয়ে শুধু মানুষের ঈর্ষা আর ‘ভিলেজ পলিটিক্সের’ শিকার হয়েছি। কিন্তু, আমার মায়ের  শিক্ষা ধরে রেখেছি সব কিছুর বিনিময়ে।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে মানসম্পন্ন ম্যাগাজিন ‘বাংলাদেশ টুডে’-তে থাকাকালীন আমি একটি সন্মানিত সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের একটি ফেলোশিপ পাই। মনে আছে অনেকে খুব খুশি, কিন্তু কেউ কেউ মানতে পারলেন না। সৃষ্টি হলো নতুন কিছু মানুষের সঙ্গে সমস্যা।

Dag Hammarskjold ফেলোশিপটা একটা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রতি বছর তৃতীয় বিশ্ব থেকে দুই-একজন সাংবাদিকের আনা হয় এবং নিউ ইয়র্কে কর্মরত খুবই খ্যাতিমান সাংবাদিকরা বাছাই করেন কারা ওখানে যাবে, তাই সেখানে সুপারিশ বা পক্ষপাতের কোনো সুযোগ নাই।

ফিরে এসে কিছুদিন পর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় যোগ দিই এবং দুই তিন বছরের মাথায় ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিতে যোগ দিই। অনেকে মেনে নিতে পারলেন না। আর বিপদ হলো এই যে, এর পর থেকে অনেকেই আমার সঙ্গে খবর শেয়ার করছেন না।

কিন্তু দীর্ঘ প্রায় দুই দশকে একটি জায়গায় আসতে পেরেছিলাম। সেখানে এক সিনিয়র সাংবাদিক তা মেনে নিতে পারলেন না। এএফপি কর্তৃপক্ষ আমাকে বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে প্রমোশন দেয়। উনি তাদের বললেন ওটা ঠিক নয় বরং সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে নিয়োগ দিলেই ভালো হয়। কর্তৃপক্ষ তার কথায় কর্ণপাত করেনি।

রাজনৈতিকভাবে উনি বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের ব্যাপারে বিরূপ ছিলেন যার ফলে ঐতিহাসিক কিছু তথ্য নিয়ে বাকবিতণ্ডা হতো। তাই আমি হয়ে উঠলাম বিপক্ষ। একটা বিরাট সমস্যা হয়ে গেল। শুরু হলো প্রচারণা নাদীম কাদির আওয়ামীপন্থী এবং আমার রিপোর্ট তাদের পক্ষে যায়। এর কারণ আমি মিথ্যা আর ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি।

উনি বিএনপি-জামায়াত করলে অন্যায় নাই, আর আমি আওয়ামী লীগ করলে চলবে না। এরপর আমাকে ‘চোর’ সাজানোর এক ষড়যন্ত্র হয়, যখন অফিসে রাখা বৈদেশিক মুদ্রা চুরি হয়ে যায়। আমাকে কোর্টে দাঁড় করানোর জন্য বহু চেষ্টা চলে, কিন্তু কর্তৃপক্ষ সব থামিয়ে কেস প্রত্যাহার করে নিতে বলেন। তারা আমাকে বলেছিল, উনি নাকি আমাকে ইঙ্গিত করে গেছেন এ চুরির নায়ক হিসেবে। এক পুলিশ অফিসার একই কথা আমাকে তখন বলেছিলেন।

সহজ অস্ত্র ছিল যে বাবা নাই তাই টাকার প্রয়োজন। কী হাস্যকর, মা বেঁচে থাকা পর্যন্ত তার হোটেলেই ছিলাম আর আমার টাকা দিয়ে শুধু বেড়িয়েছি দেশ-দেশান্তর। আরেকটা হলো, একটা বেনামি ইমেইল গেল এএফপির প্যারিস সদর দপ্তরে। সেটা আমার উপর চাপানোর চেষ্টা চালানো হয়। পরে দেখা গেল, একজন জুনিয়র সহকর্মী এ দুষ্টুমিটা করেছিল, কিন্তু মেইলটা পড়ে মনে হয়েছিল সিংহভাগ আমার বিপক্ষে।

সে আমাকে সরিয়ে গদি দখল করার চেষ্টা করেছিল। সিনিয়র সহকর্মীর বিরুদ্ধে যায় এরকম ইস্যু খুব একটা কিছু ছিল না। হায় বাঙালি, যে ইমেইল পাঠিয়েছিল তাকে আমিই এএফপিতে সুযোগ করে দিই! শেষ পর্যন্ত নখরামি থেকে বাঁচার জন্য এএফপি ছেড়ে দিই। এরপর বেশ কিছুদিন গেল ছোটখাটো ঘটনা দিয়ে।

হঠাৎ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাই কমিশনে মিনিস্টার (প্রেস-মিডিয়া) হিসেবে পাঠালেন। আমি অভিভূত। প্রধানমন্ত্রী আমার কাজের মূল্যায়ন করেই পাঠিয়েছেন। তার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। কারণ উনি আমাকে শুধু একজন সাংবাদিক হিসেবে কেবল সম্মান দেননি, আমার কাজের প্রশংসাও করেছেন। এত বড় পাওয়া বঙ্গবন্ধুর কন্যার কাছ থেকে যা আমি ভাবতেও পারিনি কোনোদিন।

এ ছাড়া আমার মা চেয়েছিলেন, আমি ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে একজন কূটনীতিক হই। কিন্তু নেশা ছাড়তে পারিনি, তাই আজ সাংবাদিক।

শুরু করলাম এক নতুন যাত্রা। লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনে অনেক যুদ্ধে করে আমি আমার টার্গেট অর্জন করি যা প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা ও দোয়া এনে দিয়েছিল আমার জন্য। কিন্তু কিছু সহকর্মীর তা ভালো লাগেনি। আর ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে বুঝতে পারলাম, আমাকে সরানোর জন্য ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে ছিলেন দুই একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সাংবাদিক। এরা আমার ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন।

হলুদ সাংবাদিকতার প্রতিবাদ করতে আর তাদের আবদার রাখতে না পেরে এ পরিণতি। তাই বুঝতে পারছেন এক বিরাট সার্কেল আমার পিছে আর আমার আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই। তাও বারবার চেয়েছি, ২০১৭-এর মে মাসে আমার দুই বছরের চুক্তি শেষ করে চলে আসতে। কিন্তু তথ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, থাকতে হবে। তারা আমার কাজে ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারপর দেখলাম, আরেক মন্ত্রণালয় জোরেশোরে মাঠে নেমেছে ওই গদিটা খালি করতে।

কারণ মূলত তারা আমার কাজের প্রশংসার পরিধি ও জনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারছিলেন না। কিছু মিথ্যা এবং বানোয়াট অভিযোগ করা হয় সরকারের কাছে, আমার সম্বন্ধে। আরেকটা হলো তাদের পছন্দের কাউকে পাঠাতে চান।

জানামতে, তারা মুজিব কোট লাগাচ্ছেন এখন। কিন্তু এ ছাড়া কী যোগ্যতা আছে তা অনেকের কাছেই প্রশ্ন। আমার মন্ত্রণালয় চায়, আমি লন্ডনে থাকি। কারণ আমি যে সব কাজ করেছি তা ৪৬ বছরে এ প্রথম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেনো চাপ সৃষ্টি করবে তা ঠিক বুঝলাম না। কাজ হয়নি, আরও কয়েকমাস থেকে দেশে ফিরলাম।

এইটুকুই কাজ হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী আরও দু’এক বছর থাকার সিদ্ধান্তটা ভেস্তে গেছে। সবার জন্য শুভ কামনা আর এখন, এ বয়সে, কি চাকরি নিয়ে ঘুমিয়ে থাকব? উত্তর দিন পাঠক বন্ধুরা...

নাদীম কাদির : সাংবাদিক।
nadeemqaadir1960@gmail.com

 

আজকের প্রশ্ন

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বিএনপির নেতারা মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি করছে। আপনিও কি তাই মনে করেন?