বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

মঙ্গলবার, ০১ মে, ২০১৮, ১২:৪৫:৪৯

দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা

দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা

মাসুদা ভাট্টি
এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক দল দ্বিতীয় মেয়াদ পূর্ণ করতে যাচ্ছে সরকার গঠনের। যদিও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে বহুবিধ সমালোচনা রয়েছে কিন্তু তারপরও পর পর দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা এদেশে এখনও পর্যন্ত আর কোনো রাজনৈতিক দলের হয়নি। ভবিষ্যতে হবে কিনা তা নিয়ে আলোচনা চলতে পারে কিন্তু তার আগে যে কোনো সরকারের প্রথম মেয়াদের চেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদ কেন এবং কী ভাবে গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে আলোচনা করার আগ্রহ বোধ করছি।

সাধারণত বলা হয়ে থাকে যে, প্রথম মেয়াদের অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্তির জন্যই দ্বিতীয় মেয়াদে জনগণ কোনো রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়ে থাকে। পশ্চিমা গণতন্ত্রে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এমনটি হতে দেখা যায়। অপরদিকে ভারতের মতো বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার জন্য নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলকে তাদের জোটের আওতা বাড়াতে হয়, যেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে প্রয়োজন হয় না কারণ এসব দেশে গণতন্ত্র মূলতঃ দ্বি-দলীয়।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নতুন যুগে প্রবেশের পর প্রথমতঃ যে শিখণ্ডি তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে সেটিই কতোটা গণতান্ত্রিক সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে পাঁচ বছর দেশ পরিচালনার ভার দেওয়ার পর কেবলমাত্র নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাদের প্রতি অনাস্থার বিষয়টি রীতিমতো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। এর সঙ্গে যদি আমরা যোগ করি এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেও বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার নানাবিধ আয়োজনের কথা তাহলে বলতেই হবে যে, এদেশে ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতায় থাকাটাই আসলে একমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, এর বাইরে রাজনীতির আর কোনো উদ্দেশ্য আছে বা থাকে বলে আমাদের সামনে প্রতীয়মান হয় না।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় থেকে বাইরে রাখার প্রবণতা এদেশে ছিল। সেই দলটিই যখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছে তখন তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিটি বাতিল করেছে। মূলতঃ এই অজুহাতে যে, এর ফলে একদল অনির্বাচিত ও অ-রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রাজনীতিবিতদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ লাভ করে এবং তাতে গণতন্ত্রের কোনো বিরাট লাভ হয় না। বরং, রাজনীতিবিদদের চরিত্রহরণের সঙ্গে সঙ্গে গোটা রাজনৈতিক সরকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হয়। সে সুযোগে এদেশে অ-রাজনৈতিক পক্ষগুলোর জন্য ক্ষমতা দখলের পথও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

কিন্তু এই নিশ্চয়তা কেউ এখনও দিতে পারছে না যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল কিংবা সংবিধানে অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখলকে অবৈধ ঘোষণা করার ফলে বাংলাদেশে আর কখনওই এরকম দুর্ঘটনা ঘটবে না। তবে প্রথম মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে এরকম শিখণ্ডি অ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা বাতিল করাটা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী কাজ ছিলো। এর সঙ্গে আমাদের যুক্ত করা উচিত যুদ্ধাপরাধের বিচারকেও, যা বাংলাদেশের জন্ম প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ততো বটেই, সেই সঙ্গে এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

এদেশের নাগরিক হয়ে এবং এদেশে রাজনীতি করেও যদি কেউ এদেশের স্বাধীনতা ও অখণ্ডতায় বিশ্বাস না করে, পদে পদে দেশটাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করে এবং মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে বার বার ভূলুন্ঠিত করে তাহলে সেই অমার্জনীয় পাপের কঠোর বিচার হওয়াটা জরুরি যেমন তেমনই যে কোনো দেশের আদিপাপ হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে সৃষ্ট অপরাধ। বাংলাদেশকে এই আদিম পাপ থেকে মুক্ত করাটা প্রয়োজন ছিল, তাই-ই নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে এই গর্হিত অপরাধ থেকে মুক্ত করাটাও ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দেশের সাধারণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রথম মেয়াদে এই দু’টি বিশেষ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের গৃহীত পদক্ষেপকে মোটা দাগে আমরা চিহ্নিত করতে পারি।

কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন হওয়াটা আওয়ামী লীগের জন্য খুব সহজ কাজ ছিল না কারণ সরকারের প্রথম দু’বছর দেশব্যাপী যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে মোকাবিলা করে সরকারকে টিকে থাকতে হয়েছে তাতে আওয়ামী লীগ যে তার মেয়াদ পূরণ করতে পারছে সেটাই তখন কেউ ভাবতে পেরেছিলেন কিনা তাতে সন্দেহ রয়েছে। প্রথম মেয়াদে বিডিআর বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে একেবারে শুরুতেই যে অঘটন দিয়ে সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় মেয়াদেও প্রথম দু’বছরের অশান্ত পরিবেশ সরকারের কাজের ক্ষেত্রকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল। এর সঙ্গে আমরা যুক্ত করতে পারি ভয়ঙ্কর জঙ্গি তৎপরতাকে, যা কেবল দেশের সাধারণ নাগরিকের জীবনকেই বিপন্ন করে তোলেনি আন্তর্জাতিক ভাবেও দেশকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে তুলেছিল।

সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর হাতে রাজনৈতিক সহিংসতা ও দেশের ভেতরকার ভয়াবহ জঙ্গি তৎপরতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদে এটাও নিশ্চয়ই সরকারের সফলতা হিসেবেই উল্লেখিত হওয়ার কথা। যদিও একে সফলতা হিসেবে ধরতে অনেকেই রাজি হবেন না। কিন্তু একথা কেউ একবারও ভেবে দেখেছেন কিনা জানি না যে, জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের হাত থেকে বাংলাদেশকে কঠোর হাতে রক্ষা করা না গেলে আজকে যেটুকু অর্থনৈতিক অগ্রগতিই বাংলাদেশের জনগণ ভোগ করুক না কেন, সেটুকুও কি উদযাপন সম্ভব ছিল? ছিল না। উল্লেখযোগ্য আরো একটি বিষয় আমাদের প্রত্যেকেরই নজর এড়িয়ে যায় যে, এতো অস্থিরতা ও বিরুদ্ধ পরিবেশ মোকাবিলা করেও আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত সংস্থাগুলো অর্থনৈতিক সূচকে দেশের এগিয়ে যাওয়াকে সাফল্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে এখন আর এড়িয়ে যেতে পারে না।

দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা না থাকায় আমরা দেখতে পাই যে, একটি নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়েও আওয়ামী লীগ বহু ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এর মধ্যে প্রধানতম ব্যর্থতা হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। আওয়ামী লীগ একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দল হওয়ার পরেও দলটি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে কোনো ভাবেই নিজের দলটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। তার সরাসরি কুফল পড়েছে জনগণের ওপর, ক্ষমতায় থেকে জনগণের জন্য কষ্টের কারণ হওয়ার চেয়ে ব্যর্থতা আর কিছুই হতে পারে না। দলকে না সামলে ক্ষেত্র বিশেষে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তৃণমূলের অন্যায় ও অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বিশেষ করে এক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ভূমিকা ন্যক্কারজনক বললে কম বলা হবে।

অপরদিকে যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাফল্যকে আন্তর্জাতিক ভাবে ‘প্যারাডক্স বা বিস্ময়’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে তার মূল অংশীদার ব্যাংকিং সেক্টরকে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে এসে একেবারে তছনছ করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে দলের ভেতরকার নেতৃত্ব আর মূল নেতৃত্ব কখনোই দলকে নিয়ে একভাবে ভাবতে পারেনি বলেই গোটা দেশে দলীয় কোন্দল এখন ভয়াবহ অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে। সেই সঙ্গে যদি আমরা যোগ করি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বস্থানীয়দের অনেকের যোগসাজশে দেশের ব্যাংক ও শেয়ার বাজারে কারসাজির মাধ্যমে অর্থনীতিকে কাবু করে ফেলায়, আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্ব যখন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন কিংবা উন্নয়নের চিত্র মানুষের সামনে প্রকাশ করেন তখন সেটি মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পায় না। আর এটাই হচ্ছে দ্বিতীয় মেয়াদে এসে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

আমরা যদি সামগ্রিক ভাবে বিচার করি তাহলে দেখতে পাই যে, শেখ হাসিনা যেভাবে দেশকে, জাতিকে একটি নতুন ও সহস্রাব্দের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য তার সমস্ত শক্তি দিয়ে মাঠে নেমেছিলেন, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে শেখ হাসিনার এই একক তৎপরতাকে মূল্যায়নতো করতেই পারেনি বরং দলটির ভেতরকার নেতৃত্ব ও তৃণমূলের অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেশের স্বার্থকে দূরে রেখে নিজের গোলাটাই কেবল ভরেছেন। ফলে যারা এই গোলা ভরার সুযোগ পাননি (যাদের সংখ্যাই সর্বাধিক) তারাই এখন আওয়ামী লীগের পক্ষেতো নেই-ই বরং তারা এখন দলটির বিপক্ষে নেমে কাজ করছে। তাদেরকে এ জন্য কোনো দোষ দেয়া যাবে না, কারণ আওয়ামী লীগের দলীয় নেতৃত্বই যখন এই দোষে দুষ্ট তখন যারা মূলতঃ সরকার দেশকে কী দিলো, নিজের ভাগ্যের কতোটুকু উন্নতি হলো সেটা বিবেচনা করেই নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়ে থাকে, তারা কেন আওয়ামী লীগের সামান্য দোষত্রুটিকেও ক্ষমা করবে? সেটা কেউ করার কথা নয়, এবং করবেও না।

অথচ, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ চাইলেই এসব দোষত্রুটি কাটিয়ে উঠতে পারতো এবং এদেশটাকে এখন যতোটুকু করেছে তার চেয়েও অনেক বেশি সফল করে তুলতে পারতো। দুঃখজনক সত্য হলো, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে সেটা তাদের মতো একটি অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ দলের কাছ থেকে কেউই আশা করেনি। চরম ভাবে মানুষের আশাভঙ্গ হয়েছে। কিন্তু তাই বলে মানুষের সামনে কি আওয়ামী লীগের বিকল্প কিছু আছে? যাদেরকে নিয়ে মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারে? এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। আগামীতে এর উত্তরে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে রইলো।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

masuda.bhatti@gmail.com

 

আজকের প্রশ্ন

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বিএনপির নেতারা মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি করছে। আপনিও কি তাই মনে করেন?