রবিবার, ২১ অক্টোবর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ১০:৪৩:২৪

ড. কামাল হোসেনের কাঁধটি কত চওড়া?

ড. কামাল হোসেনের কাঁধটি কত চওড়া?

মাসুদা ভাট্টি

এই মুহূর্তে দেশের রাজনীতিতে আলোচিত বিষয় হচ্ছে দু’টি। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ‘স্বপ্নভঙ্গ’ এবং ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াতের নতুন সরকারবিরোধী জোট। বোঝাই যাচ্ছে, ২২ সেপ্টেম্বর যদি সে রকম কোনও জোটের ঘোষণা আসে, তাহলে সিনহার ‘স্বপ্নভঙ্গ’ই হবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এই জোটের অন্যতম মূল অস্ত্র। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেমন বলেছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পক্ষ আসলে দু’টি; একটি আওয়ামী লীগ, অন্যটি আওয়ামীবিরোধী। ড. কামালের নেতৃত্বে সে রকমই একটি জোট হতে যাচ্ছে বলে এখনপর্যন্ত মনে হচ্ছে। যদিও এই জোটের অনেক চেহারাতেই লেগে আছে আওয়ামী লীগের সাবেক রঙ। এ রঙ মুছে ফেলতে তারা যে মরিয়া, তার প্রমাণও আমরা পাচ্ছি ক্রমশ।

ধরে নিচ্ছি, ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলিস্তানে বঙ্গভবনের পাশেই অবস্থিত মহানগর নাট্যমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগবিরোধী সবচেয়ে বড় ঐক্য। এই ঐক্য মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ, আধুনিকতা ও পশ্চাৎপদতা, সাম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িকতা, গণতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক, বিপ্লবী ও আপসকামিতা। আর এসবের আড়ালে সবার একটিই উদ্দেশ্য থাকবে, তা হলো, আওয়ামী লীগ ঠেকাও। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জঙ্গিবাদমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, উদার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কথা মুখে বললেও এই জোটের পক্ষে সেটি সম্ভব হবে না। কারণ এই জোটের সঙ্গে যুক্ত বড় বড় রাজনৈতিক পক্ষটির অবস্থানই এসবের বিপক্ষে। ফলে আমরা ২২ সেপ্টেম্বর থেকে এটাও বুঝতে পারবো যে, জঙ্গিবাদমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধ চেতনার উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দায়িত্বটি কেবলই আওয়ামী লীগের এবং তার নেতৃত্ব কেবলই শেখ হাসিনার, যিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা, যার পিতা আসলে এসব আদায়ের লক্ষ্যে এই মাটিতে মিশে গিয়েছেন।

অনেকেই হয়তো ভাবছেন, যে ঐক্য এখনও আত্মপ্রকাশই করেনি, তা নিয়ে এরকম নেতিবাচক কথা কেন লিখছি। ড. কামাল হোসেনকে অনেকেই অনেক কিছু বলে গাল দেন, কিন্তু তার সম্পর্কে এ কথা কেউই বলতে পারবেন না যে, তিনি একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ কিংবা তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেন না। তাকে আমরা দেখেছি অ-রাজনৈতিক সরকারকে ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বলে বৈধতা দিতে। তিনি দেশের স্বার্থের চেয়ে বিদেশি তেল কোম্পানির স্বার্থ ভালো বোঝেন বলে অনেকে বলে থাকেন। কিন্তু তাকে কেউ কখনও জঙ্গিবাদকে সমর্থন দিতে দেখেননি। তিনি রাজাকার, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পক্ষে কখনও আদালতে দাঁড়াননি। যদিও তিনি তার জামাতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পক্ষে দাঁড়ানোই শুধু নয় সব ধরনের বিদেশি সহযোগিতা জোগাড় করে দেওয়া ঠেকাতে পারেননি। দু’জন বয়স্ক ব্যক্তির কর্মকাণ্ড যার যার নিজস্ব, সে হিসেবে আমরা তার জামাতার জামায়াতপ্রীতির জন্য ড. কামাল হোসেনকে দোষ দিতে পারি না। তিনি দুর্নীতিবাজ বলে কখনও খ্যাত হননি। যদিও তিনি আয়কর ফাইল খুলেছেন অনেক দেরিতে, এবং তিনি আয়কর না দেওয়ায় জরিমানাও দিয়েছেন বলে জানা যায়। তিনি প্রকাশ্যে কখনও কোনও দুর্নীতিবাজের জন্য আদালতে দাঁড়াননি এটাও আমরা জানি। আইনজীবীদের নাকি কোনও মা-বাপ থাকে না, তারা যে কারও জন্যই অর্থের বিনিময়ে আদালতে দাঁড়িয়ে থাকেন, কিন্তু ড. কামাল হোসেনকে আমরা এক্ষেত্রে খুব বেশি দোষীও করতে পারি না। দেশের রাজনীতি নিয়ে তার নিজস্ব মত ও পথ রয়েছে। অনেকের সঙ্গে সেটি না মিললেও, তার পথ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা কেউ এদেশে করেনি। তিনি আজকে যে দেশে গণতন্ত্র নেই বলে মাঠে নেমেছেন, তার গণতান্ত্রিক অধিকার এখনপর্যন্ত ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে তো কোনও প্রমাণ আমরা পাচ্ছি না। তার পরিবারের বাকি সদস্যরা সরকারের বিরুদ্ধে আদালত ও আদালতের বাইরে, এমনকি বিদেশে সমান তালে লড়ে যাচ্ছেন। তিনি নিজে সরকারবিরোধী ঐক্য গঠনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরেই, তার বক্তব্য গণমাধ্যম সর্বোচ্চ গুরত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে, তার দল যখন-তখন যেখানে ইচ্ছে সভা করতে পারছে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও তার জন্য সুপারিশ করছেন বলে জানতে পারা যায়। ফলে গণতন্ত্র তার জন্য ‘নেই’ বললে, সেটা বেশ অ-সত্য ভাষণ বলে মনে হতে পারে।

বিএনপি-জামায়াতের জন্য ‘গণতন্ত্র’ ভিন্ন হলেও হতে পারে। কারণ সরকারের অভিজ্ঞতা বিএনপি-জামায়াতের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগুন-সন্ত্রাস থেকে শুরু করে দেশকে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়ার দীর্ঘ ও ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা বর্তমান সরকারের রয়েছে। সেক্ষেত্রে সরকার যদি বিএনপি-জামায়াতের ক্ষেত্রে ‘গণতান্ত্রিক’ অধিকার কিছুটা খর্ব করেও থাকে, তাহলে আমরা সরকারের নিন্দা করতে পারি কিন্তু সে জন্য সরকারকে ‘ফেলে’ দেওয়ার পক্ষপাতী কেউ হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং ড. কামাল হোসেন ও তার গণফোরামকে আমরা বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে এক কাতারে ফেলতে পারি না কোনোভাবেই। এমনকি নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার কথাও যদি বলি, তিনি জেল খেটেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি ‘লাশ’ চাওয়ার কারণে। যেকোনও সুস্থ রাষ্ট্রই এরকম ভয়ঙ্কর উসকানির জন্য যেকোনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারে এবং সেটা উচিতও। প্রশ্ন হলো, ড. কামাল হোসেন কি এসব বিষয় তার ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে মীমাংসা করে নিয়েছেন আগেই? নাকি তিনি শেখ হাসিনাকে সরানোর উদ্দেশ্যে এসব অমীমাংসিত সমস্যার কোনোরকম সমাধান ছাড়াই একটি আওয়ামীবিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতে যাচ্ছেন?

এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমাদের জানতে হবে, অমীমাংসিত সমস্যাগুলো কী কী। দীর্ঘ আলোচনায় না গিয়ে আমরা প্রথমেই বলতে পারি যে, বিএনপি’র জন্ম একটি অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে, হয়তো তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের সামিল করেছে ঠিকই কিন্তু তাতে তাদের অগণতান্ত্রিক চরিত্র কতটুকু বদলেছে? যদি বদলাতো তাহলে কোনোরকম আলোচনা-বৈঠক ছাড়াই দলের গঠনতন্ত্র বদলে দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত ও পলাতক তারেক জিয়াকে দলীয় প্রধান বানাতে নির্বাচন কমিশন ছুটে যেতো কি? ড. কামালের মতো আইনজ্ঞ এই বিষয়টি কি মাথায় রেখেছেন যে, তিনি কিন্তু বিএনপি’র সঙ্গে ঐক্য করে বিএনপি’র একাধিক প্রধান নেতৃত্বের দুর্নীতির বোঝাটিও তার কাঁধে তুলে নিচ্ছেন। খালেদা জিয়ার মামলা নিতে এখনও স্বীকৃত হননি বলেই আমরা জানি কিন্তু তিনি তার দলটিকে নিয়ে নিচ্ছেন তার ‘ঐক্যের’ নামে–এই বিশাল দুর্নীতির বোঝা কি তিনি বইতে পারবেন? তার কাঁধটিকে কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, আইনিভাবেও শক্ত করতে হবে নিশ্চিত। ধরা যাক এই ঐক্য গঠন করে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তারা সরকার গঠন করলেন। সরকার গঠন করেই তাকে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে, তারেক জিয়াকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে, বাকি সব দুর্নীতি মামলা থেকে বিএনপি নেতাদের মুক্ত করতে হবে– জনগণ তার এই বিশাল ‘দুর্নীতি মুক্ত কমিশন’ মেনে নেবে কি? তিনি তো এখন সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধেই কথা বলে জনগণকে তার পাশে চাইছেন, বিষয়টি স্ববিরোধী হলো কিনা, ড. কামাল নিশ্চয়ই ভেবে দেখবেন?

আসি জামায়াত প্রসঙ্গে। বিএনপি কি জামায়াতমুক্ত হবে, না জামায়াতই বিএনপি’কে মুক্ত হতে দেবে না–এ বিষয়ে দু’পক্ষের দেওয়া-নেওয়া অত্যন্ত জটিল ও গভীর। জিয়াউর রহমান জামায়াতকে পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে আসার সুযোগই করে দিয়েছিলেন–তারেক জিয়া কথিত ‘এক মায়ের পেটের দুই ভাই’ হওয়ার জন্য। ড. কামালের পক্ষে এই ভ্রাতৃত্ব বিনষ্ট করার কোনও সুযোগ থাকবে না বলেই বিশ্বাস করি। তার মানে ড. কামালকে শেষপর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থানেও নিয়ে যাবে এই নতুন ঐক্য, যেখানে প্রকাশ্যে না হোক অ-প্রকাশ্যে জামায়াত থাকবেই, জনগণকে সেটা তিনি কোনোভাবেই বিশ্বাস করাতে পারবেন না যে, তার ঐক্যের নেপথ্যেও জামায়াত নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংবিধান রচয়িতা হিসেবে তিনি নিজেকে দাবি করেন অথচ যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য করে নিজের অবস্থানকে তিনি আরও কতটা হালকা করবেন সে প্রশ্ন ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাকুক।

যে গণতন্ত্রের কথা তিনি আজকে বলছেন এবং প্রকাশ্যে বলছেন–দেশে গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্র বিএনপি-জামায়াত কতটুকু তাকে দিয়েছিল, কারা তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছিল, সেকথা তিনি ভুললেও জনগণ ভুলেছে কি? তিনি এসব দায় স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন কেবল আওয়ামীবিরোধিতার জন্য। প্রশ্ন হলো, এ দায় তিনি তার জীবনের এই সায়াহ্নে এসে মেটাতে পারবেন তো? যে গণতন্ত্রহীনতা, বাক স্বাধীনতা, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ড. কামাল হোসেন আজকে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন এবং প্রায় সফল হতে চলেছেন সেগুলো নিয়ে তিনি যাদের সঙ্গে ঐক্য করছেন অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াত, তাদের সঙ্গে সামান্যও আলোচনা করেছেন কিনা সেটা জানার ইচ্ছে হয় খুব। তিনি কি তার ঐক্য-সঙ্গীদের কাছ থেকে এই ‘অঙ্গীকার’ নিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে তারা ক্ষমতায় এলে ওপরের এই সবই জনগণকে না হোক অন্তত তাকে দেবে? আমরা একথা ধরেই নিচ্ছি যে, জনগণের কিছু থাক বা না থাক, ড. কামাল ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য ‘গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা’ থাকলেই চলবে, হয়তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ‘কম্প্রোমাইজ’ করা যেতে পারে, যা ইতোমধ্যে তার পরিবারের সদস্যরা করেছেন কিন্তু দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদের কী হবে? ড. কামাল হোসের কাঁধে যে এসবও চেপে বসবে, তখন? ড. কামাল হোসেনের কাঁধটি কত চওড়া, তার পরীক্ষাই এই ‘ঐক্য’ বারবার দেবে বলে বিশ্বাস করি।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

 

আজকের প্রশ্ন

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বিএনপির নেতারা মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি করছে। আপনিও কি তাই মনে করেন?