শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ,২০২০

Bangla Version
  
SHARE

সোমবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১০:০৩:১২

এশিয়ায় আমেরিকার ফিরে আসা

এশিয়ায় আমেরিকার ফিরে আসা

গৌতম দাস
চারদিকে বলাবলি শুরু হয়েছে, আমেরিকা নাকি ফিরে আসছে। সোজা কথায়- অন্তত চেষ্টা করছে। ফিরে আসা অর্থ হলো, দুনিয়াজুড়ে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রভাববলয় ছিল আমেরিকার। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের ফলে আমেরিকার প্রভাববলয় কমতে শুরু করেছিল। সেই প্রভাবে ফিরে আসার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে এখানে। তাও সেটা নাকি আবার বিশেষ করে এশিয়ায়; মানে এশিয়ান প্রভাববলয় ফিরে গড়ে নিতে চায় আমেরিকা। কিন্তু সারকথা হলো, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয়ের নিজ আয়ু শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকা যদি নিজেই নিজের আয়ু ধরে টানাটানি করে, তাহলে সেটা ঠেকাবে কে?

বাস্তবতা হলো, অন্য মহাদেশের অবস্থা যাই হোক, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয় বজায় থাকার শর্ত এখনো আছে, নিঃশেষিত হয়নি হয়তো। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রভাব নেই বা চোখে পড়ার মতো কমে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার নিজ ভুলনীতির কারণে। এককথায় এই নীতিটা হলো- দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের চোখ দিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত। বিশেষত এশিয়ায় তথাকথিত আমেরিকান নিরাপত্তা নাকি আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে। চলতি শতকের প্রথম দশক থেকেই এটা শুরু হয়েছিল। ভারত নিজের সিকিউরিটি স্বার্থ দেখলে তাতে আমেরিকান সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা স্বার্থও, মানে ওয়্যার অন টেররের ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ দেখা হয়ে যাবে।

কিন্তু এটা আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ বলে চালিয়ে দিলেও এটা কোনো নিরাপত্তা স্বার্থই ছিল না। তাহলে কী স্বার্থ এটা? এটা হলো আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ স্বার্থ। এটাই সে ভারতকে দিয়ে করাতে গিয়ে বিনিময়ে সে ভারতকে এশিয়ায় ভারতের পড়শি অঞ্চলে একটা মাতবরি করতে দিয়েছিল বা প্রশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু আজ কমপক্ষে ১২ বছর হয়ে গেল। এর পরিণতি ও ফলাফল কী হয়েছে? সেই স্টক টেকিং বা তাতে এর লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে, সেই হিসাব বুঝে নেয়ার সময় হয়ে গেছে।

আমেরিকার বারাক ওবামার দুই মেয়াদ, অর্থাৎ আট বছরের (২০০৯-১৬) সময়কালে উল্লেখযোগ্য দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নেয়া হয়েছিল। এক. আরব স্প্রিং আর দুই. চীন ঠেকানো (কন্টেনমেন্ট)। এর মধ্যে আরব স্প্রিং যা ছিল মূলত মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচিত সরকার ও লিবারেল শাসন কায়েম করার প্রোগ্রাম। সাধারণভাবে পরিণতির কথা বললে, আমেরিকার আরব স্প্রিংয়ের প্রোগ্রাম ফেল করেছে। যেটা সামগ্রিকভাবে অন্তত মিসরে ফেল করেছে, একমাত্র তিউনিসিয়ায় তা এখনো টেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর বাকি সব মুসলিমপ্রধান দেশেই মূলত আমেরিকার মারাত্মক কিছু অসততা প্রয়োগের জন্য তা ফেল করেছে।

এমনিতেই আমেরিকান পলিসি মাত্রই যেন তার ঘোষিত পলিসির সাথে সাথে আড়ালে লুকানো অ্যাজেন্ডাও থাকবেই, এটাই হয়ে গেছে আমেরিকান প্রাকটিস। এই লুকানো অ্যাজেন্ডামাত্রই এগুলো মূলত আমেরিকা ন্যূনতম সততা বজায় রাখে না বা পারে না এমন কিছু বাড়তি তৎপরতা। যেমন- লিবিয়ায় আরব স্প্রিংয়ের নামে গাদ্দাফিকে প্রত্যক্ষভাবে খুন করাই ছিল এর লুকানো লক্ষ্য। অথচ বাইরে বলেছে, আরব স্প্রিংয়ের লক্ষ্য। ফলাফল কী হয়েছে? গাদ্দাফিকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে আমেরিকার তেমন কিছুই সফলতা কি এসেছে, তা কেউ বলতে পারবে না।

যেমন- লিবিয়া এখন হয়েছে রাষ্ট্রহীন। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিভক্ত হয়ে আছে আর ওয়ার লর্ডের শহর হয়ে আছে লিবিয়া এখন। আর শুধু তাই না, সেকালের ওবামা-হিলারি ভেবেছিলেন তারা খুবই বুদ্ধিমান ও দক্ষ। কিন্তু না, তা একেবারেই নয়। গাদ্দাফি লিবিয়া থেকে ক্ষমতাচ্যুত ও খুন হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওবামা-হিলারির কাফফারা দেয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পাল্টা চার আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ও সহকারী আর সাথে দুই সিআইএ অপারেটর সবাই বেনগাজি এম্বাসিতে খুন হয়েছিলেন। আর তা হয়েছিল যারা ওই খুনের পরে আইএস নামে আত্মপ্রকাশ করছিল সেই হবু আইএস, তাদেরই হাতে। ওইদিকে একইভাবে সিরিয়া ছারখার হয়ে গেছে। যদিও পুতিনের কারণে প্রেসিডেন্ট আসাদ টিকে গেছে, কিন্তু তার দেশ-রাষ্ট্র সব শেষ।

এরপর সব থিতু হওয়া আর পুনর্গঠন শুরু? না তা আসার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সিরিয়া থেকেও কোনো লাভালাভ কিছুই আমেরিকা নিজের ভোগে লাগাতে পারেনি। তাহলে এই আরব স্প্রিংয়ের আমেরিকার লাভ হলো কী? এ দিকে শেষবেলায় এসে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। তাহলে স্টক টেকিং ফলাফল হলো এই যে, আমেরিকান প্রকল্প সব পানিতে গেছে। আর তা গেছে মূলত লুকানো অ্যাজেন্ডার কারণে। যদিও আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতা এতটুকুই নয়। আরো যেসব স্টান্ডিং প্রোগ্রাম ছিল ও আছে, সেগুলো রুটিনমাফিক চলছে বিশেষত, যেসব এম্বাসিভিত্তিক ‘লিডারশিপ’ বা ‘ইয়ুথ’- এই শব্দ দুটো নামের মধ্যে আছে এমন ইউএসএইড ফাইন্যান্সড, এনজিও প্রোগ্রাম সেগুলো। তবে মোটা দাগে বলা যায়, আমেরিকান কোনো পলিসি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, মূলত তার ভেতরে প্রায়ই কিছু লুকানো অ্যাজেন্ডাও সাথে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে যাওয়া হয়, মূলত এর দায় নিতে গিয়ে।

দ্বিতীয় আমেরিকান পলিসির কথা বলেছিলাম- বুশ-ওবামার চীন ঠেকানো (কন্টেনমেন্ট)। বুশের হাতে শুরু হয়েও দুই বছর চলার পর এটা ওবামার আট বছর ধরে চলে শেষে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায় এই পলিসিও। কিসের ভিত্তিতে এই পলিসিকে ব্যর্থ বলছি? প্রথমত, ‘চীন ঠেকানোর’ পলিসি মানে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের উত্থান ঠেকানো। বুশ-ওবামা এমন উত্থিত চীনের গায়ে ফুলের টোকাও লাগাতে পারেননি। ঠিক যেমন উনিশ শতকের শেষ ভাগে (১৮৮৩ সালের দিকে) এবং তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগেই আজকের চীনের মতোই কলোনি মালিক ব্রিটেন বা ফরাসিরা তাদের ছাড়িয়ে আমেরিকান উত্থান, তা ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। তবু আমেরিকান কিছু ‘আবেগি; নীতিনির্ধারক ভেবেছিলেন তাদের প্রাণপ্রিয় আমেরিকা চীনের উত্থান ঠেকিয়ে রাখতে পারবে; অন্তত বেশ কিছুদিন, তাতেই অনেক ফায়দা হবে। দু’টি রাইজিং ইকোনমি চীন ও ভারত, এদের একটাকে দিয়ে অন্যটাকে ঠেকিয়ে দিতে হবে। মনে করা হয়েছিল, এতে চীনের বদলে এশিয়ায় সবখানে না হোক, অন্তত ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে অন্তত চীনের বদলে ও তুলনায় ভারতের প্রভাব বাড়বে, বেশি করা সম্ভব হবে।

না, সেসব কিছুই করা সম্ভব হয়নি। না আমেরিকা, না ভারত কিছু করতে পেরেছিল। এর কিছুই হয়নি। ফলে চীনা উত্থান ঠেকানোর দিক থেকেও এটা ব্যর্থ। আবার আমেরিকার পলিসির দিক থেকে এটা শুধু ব্যর্থ হয়ে শেষ হলেও হতো। না তা নয়। ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে এখন বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো পড়শি দেশে ভারতের প্রভাব যেমনই থাক সেখানে অন্তত আগে আমেরিকার যে ট্র্যাডিশনাল প্রভাব ছিল, সেসবেরও কিছুই অবশিষ্ট নেই। কারণ আমেরিকা তার যাঁতা-কাঠি নিজের কথা ভুলে ভারতকে দিয়ে দিয়েছিল। আর ভারত সেই আমেরিকান ক্ষমতা পেয়েও তা নিজের প্রভাব তৈরি বা তা ধরে রাখতে পারেনি। মূলত প্রভাব ফেলতেই পারেনি। চীনের কাছে বারবার প্রায় সবক্ষেত্রেই হেরে গেছে মূলত দু’টি কারণে। এক চীনের মতো বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে ভারত চীনের ক্ষমতার সমান কেউ নয়, এর ধারেকাছের কেউ নয়। আর দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্ম থেকেই নেহরু অনুসৃত ‘কলোনিয়াল চিন্তার’ নীতি ও প্রশাসনের মানসিকতা। এর সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ হলো নেপাল।

নেপালে মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন চলছিল ১৯৯৫ সাল থেকে, যা ২০০৭ সালে নেপালি রাজতন্ত্র উৎখাত করে শেষে নতুন রিপাবলিকের কনস্টিটিউশন রচনার সমাপ্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। এই পুরো সময়ের মধ্যে চীন-নেপালের কোনো কিছুতেই কেউ ছিল না; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনোভাবেই সম্পর্কিত কেউ ছিল না। অথচ ২০১৬ সালের শুরু থেকে চীন নেপালের এক বিরাট ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়ে যায়। মূলত ভারতের ভুল নাড়াচাড়ায় নেপালিদের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ভারতকে প্রচণ্ডভাবে অপছন্দ করতে শুরু করার কারণে। অথচ মাওবাদীদের কাজ সহজ করে দিয়েছিল আমেরিকানরাই।

অকেজো রাজা প্রশাসন ও পুরনো রাজনৈতিক দলের সবার সাথেই রাজার ওয়ার্কিং রিলেশন ভেঙে পড়ায় ত্যক্ত-বিরক্ত আমেরিকা পাল্টা পছন্দ করেছিল মাওবাদীদের। আমেরিকানদের কারণে ও তাদের মধ্যস্থতায় মাওবাদীদের ভারতকে দিয়ে গ্রহণ করানো সহজ হয়ে গিয়েছিল। আমেরিকান সে উদ্যোগের কারণের ২০০৬ সালে মাওবাদীরা সশস্ত্রতা থেকে গণ-আন্দোলনের ধারায় শিফট করে ফিরে এসেছিল এবং নেপালের সব দল মিলে রাজাকে পরাজিত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। আমেরিকা মাওবাদীদের সাথে কাজ করা সম্ভব মনে করেছিল। কারণ এরা অন্তত কম্বোডিয়ার খেমাররুজ নয়। কথিত সমাজতন্ত্রের ফ্যান্টাসিও তাদের নেই। বাস্তবে এরা নাগরিক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র চায়।

এসব কারণেই এমনকি আমেরিকান মধ্যস্থতা মেনে ভারতও বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। যেমন মাওবাদীরাসহ রাজাবিরোধী সব দলের নিজেদের মধ্যে ফাইনাল রফা-চুক্তির গোপন বৈঠকগুলো সব ভারতের আয়োজনে ও নিরাপত্তায় সম্পন্ন হয়েছিল। সেটা ছিল এক ব্যাপক ও খুবই ক্রুশিয়াল সহযোগিতা। কিন্তু রাজা উৎখাতের পরে নেপালে রাষ্ট্রগঠনের কালে ভারত কাকে নিজের প্রভাবাধীন করে নেয়া যায়, এমন দল বা গোষ্ঠী খুঁজতে লেগে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভালাভের উইন-উইন সিচুয়েশনের পথে না গিয়ে ভারত কলোনিয়াল মাস্টারের ভূমিকা ও সম্পর্ক চেয়ে বসেছিল। অথচ ভারতের জন্য এগুলোর কোনো প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু ভারতের মাথায় মডেল হিসেবে ঘুরছিল ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তিটি।

কারণ, সেটা ছিল যেন এক কলোনি-চুক্তি। সেভাবেই এটা লেখা হয়ে আছে। ভারত বুঝতেই পারল না ১৯৫০ সাল আর ২০১৫ সাল এক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে গেল কেন? অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা কেন ব্রিটিশদের কলোনি মাস্টারের ভূমিকাই নিলো না কেন? জাতিসঙ্ঘ কেন ও কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, এটাও নেহরুর কখনোই বোঝা হলো না, বুঝতেই পারেননি তিনি। ফলে পরবর্তীকালের সারা ইন্ডিয়ারও পলিটিক্যাল জগৎ- এটাও এখন সব বোঝাবোঝির বাইরে, বরং উল্টো ভারতের নেহরু ডিপ্লোমেসির সাকসেস মনে করা হয় যে, তারা নেপাল বা ভুটানের সাথে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শক্তিদের মতোই চুক্তি করতে সফল হয়েছিল।

নেপাল ২০১৫ সালে নতুন কনস্টিটিউশন চালু ঘোষণা করলে ক্ষিপ্ত ভারত তার ওপর দিয়ে নেপালের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেকালে ভারতের ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া নেপালের মানুষের বাইরে বের হওয়ার আর কোনো পথ ছিল না। আর সেই থেকে প্রথম দৃশ্যপটে চীনের আগমন। নেপালের অপর সারা উত্তর সীমান্তে চীন আছে বটে, কিন্তু সেদিকে রাস্তাঘাট নেই, সেকালে ছিল না। বরং সেকালে চীনের অভ্যন্তরে সেসব নতুন হাইওয়ে রেল নেটওয়ার্ক সুবিধা তৈরি হচ্ছিল, তাতে যুক্ত হতে গেলে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় শত কিলোমিটার নতুন কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হবে। ২০১৫ সালের পরে একালে এখন সেসব তৈরি করে নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে একটা দিয়াশলাইও আমদানি না করে নেপাল এখন সহজেই চীনের ভেতর দিয়ে বা চীন থেকে জ্বালানিসহ সব পণ্য আনতে পারে। আবার নেপালের নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে আর আমেরিকা?

ভারতের হাতে সব দিয়ে দিয়ে, সব প্রভাব হারানো আমেরিকা গত মাস থেকে এখন নতুন করে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নেপালের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেছে। তবে অবশ্যই এবার আর ভারতের হাত দিয়ে খাওয়া নয় অথবা ভারতের চোখ দিয়ে দেখা নয়- সবই আমেরিকার নিজের ও সরাসরি উদ্যোগ। বরং চীনের সাথে একটা প্রতিযোগী মুডে। এই ঘটনার প্রমাণ থেকে মনে হচ্ছে, আমেরিকা ফেরত আসার চেষ্টা করছে অবশ্যই। আর ভারতের হাত দিয়ে খেতে চাওয়া পুরনো আমেরিকার একটা ভালো শিক্ষা হয়েছে, এতে তা দেখাই যাচ্ছে। একই রকম আবার ওইদিকে শ্রীলঙ্কা?

শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনে সরকার বদলের সাথে সাথে সেখানে খুবই নোংরাভাবে দলগুলো চীন বা ভারতমুখী হয়ে যাচ্ছিল। যেটা স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুদণ্ডহীন দুর্দশাকেই প্রকাশ করে। এরপর গত সরকারের শেষ দিকে তারা সেবার ভারত-চীন ছেড়ে আবার আমেরিকামুখী হয়ে যায়, মানে আমেরিকাকেও উন্নয়ন প্রজেক্ট দিয়েছিল। আগের চীনা-পছন্দ রাজা পাকসেই এর ভাই, কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার পর, এখন আমরা রিপোর্ট দেখছি নতুন সরকার আমেরিকান প্রজেক্ট স্থগিত করে দিয়েছে। প্রায় একই দশা দেখা গেছে মালদ্বীপেও। আসলে এগুলো মূলত দুর্বল সরকার ও সরকার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির লক্ষণ।

মূল কথা হলো- রাষ্ট্রস্বার্থকে দল বা ব্যক্তিস্বার্থের অধীন করে ফেলা অথবা সেকেন্ডারি করে ফেলা থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো বিদেশী সরকারকেই নিজের সরকার ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ এই স্তরে ঢুকে পড়তে এলাও করা একেবারেই অনুচিত। নিজের ক্ষমতায় থাকা বা ফিরে আসার সুবিধার কথা ভেবে কোনো সরকার একবার এ কাজ করে বসলে- চীন, ভারত বা আমেরিকা এ তিন রাষ্ট্রকে দূরে রাখা খুবই কঠিন হয়ে যাবে। তবে আমাদের জন্য এখন প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো, আমেরিকা নিজের কর্তৃত্ব-আধিপত্যের দণ্ড একবার ভারতের কাছে দিয়ে দেয়া অথবা খোয়ানোর পর এখন এসব দেশেই নতুন করে নিজের ক্ষমতার বলয় বানাতে চেষ্টা করতে নেমেছে আমেরিকা। এগুলোও আমেরিকার ফিরে উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টার নমুনা বলা যায়।

তবে ২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ওবামার আমেরিকার ভারতের বেলায় তাকে দেয়া বিশেষ সুবিধা (যেমন চীন ঠেকানোর জন্য বাংলাদেশকেই ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল)। যেমন- আমেরিকায় শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ পেত ভারত। সেগুলো সুবিধা সব সমূলে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। উল্টা শাস্তিমূলক অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেন যা কার্যত আমেরিকায় ভারতের রফতানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প।

আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সবকিছুই এখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কোনো কর্তৃত্ব আমেরিকার হাতে বা ভাগে নেই বললেই চলে। তবে গত অক্টোবরে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্ত বরাবর ভারতকে রাডার বসানোর চুক্তি করার পর থেকে আমেরিকা তোলপাড় শুরু করেছিল। কিন্তু সেটাও হঠাৎ করে এ বিষয়ে আবার সবকিছু নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। তবে সারকথা- নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ফিরে পেতে আমেরিকা আবার সব দেশেই তৎপর হতে চেষ্টা করছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

তবে আমেরিকাকে শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে এসেছিল সম্ভবত পাকিস্তান। আর মূলত সেই পাকিস্তানে আমেরিকা আবার ফিরে যাচ্ছে। আগের মতোই সামরিক সহযোগিতা ও ট্রেনিং দেয়ার এক লম্বা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

গত ২০১৬ জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ নেয়ার পর থেকে কঠোর ভূমিকা নিয়ে প্রায় তেড়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। অবস্থা এমন যেন পাকিস্তানই আমেরিকাকে আফগানিস্তানে নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান আমেরিকার সব দুঃখের জন্য দায়ী এমন মনে করা হচ্ছিল। যেমন- আমেরিকা না, পাকিস্তানই সব টেররিজমের জন্য দায়ী। যেন আফগান তালেবানের তৎপরতা বহাল আছে; পাকিস্তানের কারণে ঘটছে। এমনই ছদ্ম অভিযোগে আমেরিকান প্রতিশ্রুতির ৬০ কোটি ডলার হঠাৎ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে নেতি ও শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। এসব ঘটনা সবই পাকিস্তানের গত নির্বাচনের আগের ঘটনা। পাকিস্তানও শক্ত অবস্থান নিয়ে আমেরিকা থেকে দূরে সরেছিল। আর ততই আমেরিকা পাকিস্তানকে দোষারোপ করে চলেছে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য।

গত সরকারের আমল থেকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা খুবই খারাপ জায়গায় ঠেকেছিল। তাই নতুন নির্বাচিত ইমরান খানের ওপর আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক পম্পেও যেন গোলা ছুড়ছিলেন, যখন তিনি বললেন, আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের থেকে লোন নিয়ে চীনের লোন পরিশোধ করা যাবে না। ক্যাম্পেইন এমনই চরমে উঠেছিল। অথচ চীনা লোন কিস্তি পরিশোধের সময়কাল শুরুই হয়নি এখনো, হবে ২০২৩ সাল থেকে। যা হোক, শেষে সবই থিতু হয়েছে এখন। চীন-পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় সব ঋণ একাই চীনের থেকে পেতে পারত, কিন্তু ইমরান খান তা নিতে চাননি। কারণ, পশ্চিমা বাজারে এই খবরটা ভালোভাবে জানে না। তাই বাজারের আস্থা পেতে লোনের একটা অংশ প্রায় ছয় বিলিয়ন পাকিস্তান সেই আইএমএফের থেকেই সংগ্রহ করেছিল।

তবে আমেরিকার সাথে সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা হয়ে যায় আমেরিকার আফগানিস্তান থেকে শেষ সৈন্যকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে। এখনো যা কমপক্ষে ১০ হাজারের মতো। আমেরিকার তালেবানদের সাথে চুক্তিতে পাকিস্তানের সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাতে আস্থা রাখা যায়, এই হুঁশ থেকে আমেরিকা পাকিস্তান সম্পর্ক নরমাল হতে শুরু করেছিল। আর সেখান থেকে সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে গভীর হতে চলেছে। এটাকেই ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন’ বলছেন অনেকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়ানো, পুরো কর্তৃত্ব নেয়া, সবাইকে সাহায্য করা আর যেসব নীতিগত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে এসব আমেরিকা করতে রাজি হয়েছিল সেটা হলো- নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র ও একই ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া। পাঁচ ভেটো সদস্যের জাতিসঙ্ঘের সবাই এর চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিয়েছিল ১৯৪২ সালে। কিন্তু নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকার মেনে চলার বাধ্যবাধকতা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মাওয়ের চীন পরবর্তীকালে মানেনি বা নিজ রাষ্ট্রে চর্চা কখনো করেনি। একালে এখন চীনা অর্থনৈতিক উত্থান একটা বাস্তবতা, দুনিয়ার অর্থনৈতিক নেতা সে। কিন্তু চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রসঙ্গ?

স্পষ্ট করেই বলা যায়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকারের বাইরে থাকা চীনের পক্ষে দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব। আমেরিকার নেতৃত্বের ভূমিকা চলে যেতে গিয়েও যাবে না, যাচ্ছে না। এটাই বারবার আমেরিকার নেতৃত্বে ফিরে আসার শর্ত জাগিয়ে রাখছে, রাখবে।

তাহলে আমেরিকা কি আগের মতোই বাংলাদেশেও কর্তৃত্ব নেবে, প্রভাব, ভূমিকায় ফিরে আসবে? আর বলাই বাহুল্য- ভারতকে জুতা খুলে ঘরে ঢোকার মতো বাইরে রাখবে; এবার আর ভারতকে ভুলেও সাথে আনবে না? বিষয়গুলো এখনো আনসেটেল্ড, অবশ্যই! হ

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

আজকের প্রশ্ন

বিএনপির নেতারা আইন না বুঝেই মন্তব্য করে আইনমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে আপনি কি একমত?