বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ,২০১৭

Bangla Version
  
SHARE

রবিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৭, ১০:৫১:০০

ব্রিটিশ গণতন্ত্রে প্রদীপের নিচে বৈষম্যের অন্ধকার

ব্রিটিশ গণতন্ত্রে প্রদীপের নিচে বৈষম্যের অন্ধকার

তানভীর আহমেদ 
ব্রিটেনের রক্ষণশীলদের রাজনৈতিক দল কনজারভেটিভ পার্টির বিরুদ্ধে লেবার পার্টির দীর্ঘদিনের অভিযোগ, টোরি সব সময় এলিটদের জন্য কাজ করে। মনের ভেতরে এলিট মনোভাব পোষণ করলেও নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে হলে সকল রাজনৈতিক দলকে সাধারণের জন্য কিছু আশার বাণী শোনাতে হয়। ২০১৬ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরিসা মে ডাউনিং স্ট্রিটের দায়িত্ব গ্রহণের পর তার দেশে সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমান অধিকার নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই ঘোষণা অনুযায়ী টেরিসা মে যে কার্যত বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন সেটি গণমাধ্যমে জানাতে সকল সাংবাদিকদের ডাউনিং স্ট্রিটে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

ডাউনিং স্ট্রিটের প্রেস ব্রিফিংকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে সোমবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী টেরিসা মে’র ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে হাজির হলাম। তখনও আমার ধারণা ছিলো না নিজের কমিউনিটির ভয়াবহ তথ্যটিই আমাকে জানানো হবে। ব্রিটেনের এথনিক কমিউনিটির মধ্যে যে বাংলাদেশি কমিউনিটির অবস্থান এত ভয়াবহ সেই বিষয়টি উঠে এসেছে এথনিসিটি ফ্যাক্টস ফিগারস কমিটি’র প্রতিবেদনে। সরকারের ১৩০টি বিভাগে নীরিক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, কর্মসংস্থান ও গৃহনির্মাণে সারা দেশের তুলনায় তারা পিছিয়ে রয়েছে।
শুধু তাই নয়, এই আবাসনের ক্ষেত্রে ৪৮ শতাংশ বাংলাদেশি পরিবার সবচেয়ে অস্বাস্থ্যকর ও ওভারক্রাউডেড এলাকায় বসবাস করছে। যুক্তরাজ্যের রেসিয়াল ডিজপেয়ারিটি অডিট রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে ব্রিটেনের শ্বেতাঙ্গ কমিউনিটিতে যেখানে বেকারের সংখ্যা ৪ শতাংশ সেখানে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বেকারের সংখ্যা ১১ শতাংশ। বেকারত্বের তালিকায় তরুণদের সংখ্যা আরো বেশি। গত ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী চাকুরিহীন তরুণদের সংখ্যা ছিলো ২৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ব্রিটিশ বাংলাদেশীরা অপেক্ষাকৃত বঞ্চিত এলাকায় বসবাস করেন। গৃহায়নের ক্ষেত্রে তারা সোশ্যাল হাউজিং-এর উপর বেশি নির্ভরশীল। বঞ্চিত এই ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা যে অঞ্চলে বসবাস করেন সেই অঞ্চল থেকেই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন রুশনারা আলী।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এই প্রতিবেদনের পর রুশনারা আলী এমপির সাথে হাউজ অব কমন্সের পোর্টক্যালিস হাউজের অফিস কক্ষে কথা হলো। রুশনারা বললেন, এই তথ্য নতুন নয়। বহু বছর ধরে ব্রিটেনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ব্রিটেনে বঞ্চিত হয়ে আসছে। টেরিসা মে একদিকে বলছেন তিনি বৈষম্য কমাবেন অন্যদিকে তিনি অর্থ বরাদ্দ কমাচ্ছেন।
বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে যেসব বরাদ্দ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় সেই খাতে তিনি বাজেট কর্তন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই এই বৈষম্য দূর করতে তিনি অ্যাকশন প্ল্যান দেবেন। কার্যত প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে কোন অ্যাকশন প্ল্যানের ব্যপারে আমরা কোন দিক নির্দেশনা পাইনি।
তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এই বৈষম্যের চিত্রের মধ্যেও বাংলাদেশিদের জন্য একটা ভালো খবর হলো, সমীক্ষায় দেখা গেছে তরুণ প্রজন্মের ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা শ্বেতাঙ্গদের মতোই ইংরেজীতে পারদর্শী হয়ে উঠছে। তারা চাকুরি খোঁজার বদলে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা হয়ে উঠছে। এই তথ্যটির ভিন্ন চিত্রও রয়েছে।
বহু প্রতিশ্রুতিশীল মেধাবী ব্রিটিশ বাংলাদেশি উচ্চপদে চাকরিতে বৈষম্যের শিকার হয়ে তার যোগ্য পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বঞ্চিত হতে হতে আসলে তারা নিজেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে। বাংলাদেশীরা প্রতি ৫ জনে ১ জন নিজ উদ্যোগে স্বাবলম্বী। শুধুমাত্র নাম, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা গায়ের রঙ এর কারণে চাকরির ইন্টারভিউতে ডাক পাচ্ছেন না এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে ব্রিটেনে।
চলতি বছর ফেব্রুয়ারীতে বিবিসি’র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কিভাবে নামের কারণে যোগ্য প্রার্থীরাও চাকরির ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিবিসি’র জ্যাক এডেসিনা এবং ওয়ানা মারোসিকো, মোহাম্মদ ও অ্যাডাম নাম দিয়ে সমান যোগ্যতা উল্লেখ করে ১০০টি চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে দরখাস্ত করে।
অ্যাডাম ১২টি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকুরির নিশ্চয়তা পেলেও মোহাম্মদ মাত্র ৪টি প্রতিষ্ঠান থেকে অফার পেয়েছিলো। নামের কারণে যেন কোন সংখ্যালঘুর সন্তানরা বৈষম্যের শিকার না হন একারণে অনেক তরুণ বাবা-মা তাদের সন্তানদের নামের আগে বা পরে ধর্মীয় বা বংশ পরিচয়টি আর রাখতে চান না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে চাকরি না পেয়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
নীরিক্ষায় দেখা গেছে, ব্রিটেনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এলিটদের ৯৭ শতাংশই শ্বেতাঙ্গ অথচ ব্রিটেনের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসবাস। মিশ্র সংস্কৃতিকে নিয়ে গর্ব করা এই ব্রিটেন ওয়েস্টমিনস্টার থেকে গণতন্ত্রের আলো ছড়ালেও গণতন্ত্রের প্রদীপের নিচে যে বৈষ্যমের অন্ধকার লুকিয়ে আছে সেটা এখন আর গোপন কিছু নয়।
তবে ব্রিটেনে বর্ণবৈষম্য রোধে কঠোর নীতিমালা রয়েছে শতবছরের পুরনো কিন্তু আদতে সেটি কতটুকু কার্যকর সেটি নিয়ে আরেকটি গবেষণা প্রতিবেদন হতে পারে বটে। আশার কথা এই যে, বৈষম্যের বিষয়গুলো অন্তত পরিস্কারভাবে তুলে ধরার সাহস দেখিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরিসা মে সরকার। এখন তার দপ্তর এই বৈষম্য কমাতে দৃশ্যমান কি উদ্যোগ গ্রহণ করেন তার উপর নির্ভর করবে আগামী নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কত শতাংশ ভোট কনজারভেটিভে ঝুঁকে আসবে।
তানভীর আহমেদ: যুক্তরাজ্যের চ্যানেল এস টেলিভিশনের কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর ও একাত্তর টেলিভিশনের যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি।
tvjournalistuk@gmail.com

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

কিছু সহিংসতা ও অনিয়ম হলেও সামগ্রিকভাবে ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে—সিইসির এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি একমত?