রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ,২০১৭

Bangla Version
  
SHARE

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭, ০৮:১১:২০

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে

শেগুফতা শারমিন
ছিঃ ছিঃ ছিঃ। অমুক অত খারাপ। তমুকের ছেলেটা খুব খারাপ, নেশা করে, আজেবাজে ছেলেদের সাথে মেশে। সে তো দুই নম্বরী ব্যবসা করে। ও ঘুষ খায়। অমুক একটা মেয়েকে রেপ করলো। তমুক একজনকে খুন করলো। আমরা ছিঃ এর বন্যা বইয়ে দিলাম। বাইরের কেউ মানে, নিজের পরিবারের বাইরে যে কাউকে ছিঃ করতে, খারাপ বলতে, অপরাধী ভাবতে আমাদের কোন কমতি নেই। কিন্তু যদি অন্যভাবে ভাবি।

মানে ধরেন, অমুক বা তমুক নয়। অপরাধ করেছে, সে আপনার সন্তান বা স্বজন। তখন আপনার মনোভাব কী হবে?
৯০ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাবে, নিজের স্বজনকে বাঁচানোর চেষ্টা। আমার ভাই, আমার বাবা বা আমার আত্মীয় এই কাজটা করতেই পারে না। অসম্ভব। আর ঠিক এইখানেই আমরা ধরা খেয়ে যাই বারবার। যেমন তুফানকে সারা দেশ ছিঃ ছিঃ ছিঃ করলেও তুফানের স্ত্রী, শ্বাশুড়ীর কাছে সে নির্দোষ! শুধু তুফানের পরিবার নয়, এদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার তার নিজের মানুষের অপরাধ দেখতে পায় না। অথবা চাপা দিয়ে রাখে।
সন্তান নেশা করে, পরিবার তা গোপন রাখে। সন্তান অসৎ সঙ্গে মেশে, পরিবার মেনে নেয় অথবা পরিবারের সেই বোধটাই থাকে না বিচার করার, কোনটা ভালো কোনটা মন্দ। একদিকে সমাজ জুড়ে আহাজারী, দেশটা কোথায় গেল বলে। এ যুগের ছেলেমেয়েরা বখে গেছে বলে অথবা শহরে ভীন সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে। অথচ দেখা যাচ্ছে যার ছেলেটা বা মেয়েটা রাতে বাড়ি ফিরছে না। সে সেটা ভাবনাতেই নিচ্ছে না।
এ শহরে ইউনিভার্সিটি পড়া ছেলেমেয়েরা একসাথে বাসা ভাড়া নিচ্ছে। জীবনযাপন করছে। একবাসাতে কবে ভালোবাসা হারিয়ে আরো নানা অনাচার, অনৈতিকতা ঢুকে যাচ্ছে, অভিভাবকরা টের পাচ্ছে না। অথবা টের পেলেও চোখ বুঁজে অন্ধ সেজে থাকছে। যখন কোন একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তখন আশপাশ থেকে রব উঠে, গেল গেল! যার গেল তারই গেল। আর যাদের ইতিমধ্যেই যাওয়ার জোগাড়, তাদের তখনও চোখ বন্ধ।
পরিবার থেকে শুরু করে বৃহত্তর ক্ষেত্রেও এই চাপা দেয়া, অস্বীকার করার প্রবণতা। এতে যা হয় দিন দিন অপরাধের সংখ্যা বাড়ে। আর অপরাধীদের কোন বিচার হয় না। সোজা কথায় এদেশে একজন অপরাধী আর আমি বা আপনি সমান ঘৃণিত। কারণ ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সম দহে।’
সামগ্রিক অর্থে আমরা পরিণত হয়ে উঠছি একটা অন্যায় সহনশীল জাতি হিসেবে। আমরা সব ধরণের অন্যায় মেনে নেই। আবার বলি, অন্যের বেলায় আমরা সোচ্চার হই। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে গোপন রাখি। এই অর্থে আমরা সবাই ঘৃণিত।
অনেক আগে আমাদের এক প্রতিবেশি পরিবারে ছিল ছয় সাত জন ছেলে। তাদের ভেতর একজন মোটামুটি উঠতি মাস্তান হিসেবে তখনই বেশ পরিচিত। এলাকার মেয়েরা ভয়ে ভয়ে চলে। কিন্তু তাতে কি মজার ব্যাপার হলো তার মায়ের কাছে সেই সবচেয়ে প্রিয় সন্তান। ছেলের তার বিরাট প্রশংসা। এমন গল্প আশেপাশে প্রচুর।
এক লোককে চিনি, যে কিনা চরিত্রদোষে দুষ্টু। ঘরে নতুন বউ রেখেও প্রায় পয়ত্রিশ বছর বয়সী লোকটা একটা ১৪ বছরের মেয়েকে খারাপভাবে স্পর্শ করেছিল। কিন্তু সেই লোকের পরিবারের কেউ কোনদিন সেই লোকটাকে খারাপ বলেনি। আত্মীয় স্বজনের মাঝে সে গ্রহণযোগ্যতা হারায়নি।
এখন তার ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়েদের কাছে সে খুব ভালো বাবা। অর্থাৎ জলজ্যান্ত খারাপ একটা লোক কিভাবে পরিবারে টিকে থাকে! কেউ কোনদিন তাকে খারাপ বললো না, ছিঃ বললো না। সেই মেয়েটা যদি এতবছর পরও আঙ্গুল তোলে তার দিকে। অন্যরা বলে, চুপ চুপ চেপে যাও। অথচ পরিবারটা শিক্ষিত এবং প্রগতিশীল!
নিজের পরিবারে মানুষের সাত খুন মাফ। আবার অন্যভাবে বলা যায়, পরিবার থেকেও মানুষ অন্যায় করা শেখে। ছেলে বা মেয়ে মিথ্যা কথা বললো, মা-বাবা দেখেও না দেখার ভান করে। বুঝেও না বোঝার ভান করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বুঝতেও পারে না। ঐ যে, স্নেহে অন্ধ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তুমুল প্রতিযোগিতার। এখানে কেউ কারো বন্ধু হয় না, প্রতিযোগী হয়।
এই প্রতিযোগিতার বীজ রোপন করে দেয় পরিবার। পরিবারই শিখিয়ে দেয়, সহপাঠীর কাছে এটা গোপন রাখবে, ওটা ভুল বলবে। পরিকল্পিতভাবে, মিথ্যা শেখানোর প্রয়াস। এরপর সেই ছেলে মেয়েরা মা বাবার সাথেও মিথ্যা বলা শুরু করে। প্রথমে তুফানের কথা বললাম। এবার বলি ফুয়াদের কথা। এই যে পর্ণগ্রাফী তৈরির অভিযোগে গ্রেফতার হলো ছেলেটা। প্রায় তিন বছর যাবত নিজ বাড়িরই দুটো ফ্লাটে এই কাজ করে যাচ্ছে। পরিবার কি একটুও টের পায়নি?
একটা জিনিস খুব মজা লাগে ভাবতে। ধরুন, একজন সরকারী কর্মকর্তা। তার জীবন যাপন বলে দিচ্ছে, তার আয়ের উৎস কী। কিন্তু তার পরিবারের লোক সব সময় দাবী করবে তিনি একজন সৎ কর্মকর্তা। এখন পর্যন্ত আমার জীবনে যত সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীর পরিবারের সান্নিধ্যে এসেছি, কোনদিন কাওকে বলতে শুনিনি, আমার বাবা বা আমার স্বামী বা আমার ছেলে ঘুষ খায়। বরং সবাই দাবি করেন, তাদের পরিবারের সরকারী বাবুটি খুবই সৎ!
সেই যে বন রক্ষকের বাড়ি থেকে একবার বস্তা বস্তা টাকা বেরোল। আমরা ছিঃ ছিঃ ছিঃ করলাম। তার পরিবার কি ছিঃ করেছিল? আমার চেনা একটা মেয়ে, ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। বিয়ের পর জানতে পারে, ছেলেটার আগে যে মেয়েটার সাথে প্রেম ছিল, সে মেয়েটা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ায় আত্মহত্যা করে। পুরো পরিবার ঘটনাটা জানতো কিন্তু গোপন করে। এতে ছেলেটার চরিত্র ভালো হয়ে যায়নি। বিয়ের পরও তার সেই সব ‘ছেলেবেলা‘র অভ্যাস বজায় থাকে। অতঃপর ছাড়াছাড়ি।
অনেকবার বলেছি, আবার বলি। বছর দুয়েক আগে পয়লা বৈশাখে যে ঘটনাটা ঘটলো। সে ছেলেগুলোর কি পরিবার ছিল না? নিশ্চয় ছিল। সেই সব কুলাঙ্গারের পরিবার ছিল, পাড়ার ছোটবড় সব বখাটেদের পরিবার আছে, এদেশের সব ছোট বড় চোর বদমাশ সন্ত্রাসী ঘুষখোর ঋণখেলাপী সবার পরিবার আছে। এবং যার যার পরিবারে সে সে সমাদৃত। এদের কেউ ঘৃণা করে না, ভুল শুধরে দেয় না। উল্টো উৎসাহ দেয়।
ফলশ্রুতিতে দেশ ভরে যায় অপরাধে। অপরাধীর সংখ্যা বেড়ে যায়। বাড়ে আফসোস, বাড়ে হতাশা! বাড়ে অন্যায় মেনে নেবার সহ্য ক্ষমতা। যে সহ্য ক্ষমতা অপরাধী আর অপরাধ সহ্যকারীকে এক সীমানায় দাঁড় করিয়ে দেয়। এইসব দ্বিপেয়েদের ঘৃণা করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার থাকে না।
শেগুফতা শারমিন : কলাম লেখক, উন্নয়নকর্মী।
shegufta@yahoo.com



  0

 

 

 

 

 

আজকের প্রশ্ন

কিছু সহিংসতা ও অনিয়ম হলেও সামগ্রিকভাবে ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে—সিইসির এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি একমত?