সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ,২০১৭

Bangla Version
  
SHARE

শনিবার, ০২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১২:১৫:১৮

খালেদা জিয়াকেও হারিয়ে দেয়া হবে!

খালেদা জিয়াকেও হারিয়ে দেয়া হবে!

ঢাকা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ফেনী-১ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাদের দলীয় নেতাকর্মীরা জোরেশোরে শুরু করেছেন আগাম নির্বাচনী প্রচারণা। বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছাগলনাইয়া-পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলা নিয়ে গঠিত ফেনী-১ আসন দখলে রাখতে মরিয়া হয়ে মাঠে বিএনপি। অপর দিকে এ আসন নিজেদের দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। ওই আসনে একক প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সোহেল চৌধুরীকে নিয়ে মাঠে নিয়মিত সভা-সমাবেশ চালিয়ে যাচ্ছেন।

ওই আসনের বর্তমান এমপি জাসদ (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার আবারো মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে দলীয় প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী দিদারুল আলম মজুমদারকে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রার্থী করানোর লক্ষ্য নিয়ে গণসংযোগ করছে। জাতীয় পার্টি থেকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিশেষ উপদেষ্টা নাজমা আক্তার প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।

৯০-এর দশকে এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকে ফেনী-১ আসনে আওয়ামী লীগ বরাবরই দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। টানা দুইবার ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ফেনী-১ আসনে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা যেকোনো সময় থেকে মজবুত বলে দাবি করছে। ওই আসনে বিগত কয়েক মাস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম এবং ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল (সোহেল চৌধুরী) আলোচিত হয়েছিল।

গত ঈদুল ফিতরের পর পরশুরামে আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম কলেজের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মজুমদার আগামী নির্বাচনে আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিমকে প্রার্থী হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্য শেষে আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম মাইক হাতে নিয়ে অতীতে যেমন তিনি প্রার্থী হননি, অদূর ভবিষ্যতেও তিনি নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ার ঘোষণা দেন।

তার ঘোষণার পর থেকে দলীয় নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের সোহেল চৌধুরীকে দলীয় একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। তাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সোহেল চৌধুরীর পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন।

সম্প্রতি ছাগলনাইয়া পৌরশহরের জমাদ্দার বাজারের এক সমাবেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সোহেল চৌধুরীকে আগামী নির্বাচনে ফেনী-১ থেকে দলীয় প্রার্থী দেয়ার দাবি জানিয়ে সমাবেশ করেন। ওই সভায় মহাজোট প্রার্থী জাসদ নেত্রী শিরীন আখতারকে ছাগলনাইয়ায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সামছুদ্দিন ভুলু। সমাবেশে নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে সোহেল চৌধুরীকে আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি দাবি জানান ভুলু মজুমদার।

এই আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে নির্বাচনী লড়াইয়ে জিততে হলে আওয়ামী লীগ থেকে সোহেল চৌধুরীর বিকল্প প্রার্থী ফেনী-১ আসনে নেই বলেও জানান তারা। দলের বাইর থেকে প্রার্থী দেয়া হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভোটযুদ্ধে নাও নামতে পারেন বলে দল থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

বর্তমান এমপির সাথে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সমন্বয় নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই আসনে বিজয়ী হতে আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম, ফেনী-২ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, ছাগলনাইয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সামছুদ্দিন ভুলু, পরশুরাম উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলের সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন মজুমদার, ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলিমসহ নেতাকর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন।

এ দিকে ফেনী-১ আসনে বিজয়ী হয়ে দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ওই আসন উপহার দেয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে দলীয় কর্মকাণ্ড ও সভা-সমাবেশ করে গণসংযোগ করছেন সোহেল চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সম্প্রতি ফেনীর ফুলগাজীতে বন্যাকবলিত এলাকায় কেন্দ্রীয় ১৪ দলের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হয়। ১৪ দলের ওই কর্মসূচির নেতৃত্বে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বে কয়েকটি দলের কেন্দ্রীয় নেতারা ছাগলনাইয়া ও ফুলগাজী এলেও আওয়ামী লীগের কোনো নেতা ওই সময় তাদের সাথে না থাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বেশ উল্লসিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে চলমান শীতল যুদ্ধের মধ্যে ১৪ দলের ওই কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের কোনো কেন্দ্রীয় নেতা না থাকায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা তাদের সন্তুষ্টির কথা জানান।

আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, ফুলগাজী ও পরশুরামে আওয়ামী লীগ ভোটযুদ্ধে বরাবরই ভালো করেছিল। ছাগলনাইয়ায় অপেক্ষাকৃত কম ভোট পাওয়ার কারণে ফেনী-১ আসনে বারবারই তাদের দল হেরেছে। সোহেল চৌধুরী ফেনী-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে একক প্রার্থী হচ্ছেন দলের হাইকমান্ড থেকে ধারণা পেয়েছেন বলেও জানিয়েছেন। ওই আসনে সোহেল চৌধুরীকে জেতাতেই তারা ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন এবং সে লক্ষ্যে তারা তাদের প্রার্থীকে নিয়ে ভোটারদের মন জয় করতে মাঠে রয়েছেন।

ফেনী-১ আসন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আসন হিসেবে পরিচিত। এরশাদ পতন পরবর্তী সময়ে আসন থেকে তিনি চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিগত একতরফা নির্বাচনে ওই আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় মহাজোট প্রার্থী হিসেবে জাসদের শিরীন আখতার নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এই আসনে আবারো দলের সভানেত্রীকে জিতাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ফেনী-২ আসনের সাবেক এমপি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নাল আবদিন ভিপি, কেন্দ্রীয় সহদফতর সম্পাদক বেলাল আহম্মদ, জাতীয় কমিটির সদস্য ও পরশুরাম উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহসম্পাদক জালাল আহম্মদ মজুমদার, ছাগলনাইয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি নূর আহম্মদ মজুমদার, ফুলগাজী উপজেলা বিএনপির সভাপতি নূরনবী মাস্টারসহ দলের নেতাকর্মীরা বিএনপির নতুন সদস্যভুক্তি ও নবায়ন কার্যক্রম সামনে রেখে প্রতিটি উপজেলার পাড়া-মহল্লায় চেয়ারপারসনের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই আসনে বিএনপির ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও তিনটি উপজেলার বেশির ভাগ সাংগঠনিক শাখায় নিয়মিত কমিটি না থাকায় ত্যাগী নেতাকর্মীদের একটি অংশ নিষ্ক্রিয়। ছাগলনাইয়া, পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় বিগত আন্দোলন সংগ্রামে অনেক নেতাকর্মীর নামে বেশ কিছু মামলা রয়েছে। যার কারণে অনেকে প্রকাশ্যে দলীয় কর্মকাণ্ডে সরব হতে পারছে না।

তবে দীর্ঘ দিন ঝিমিয়ে থাকা বিএনপি কয়েক মাস থেকে রাজনীতির মাঠে অনেকটা সক্রিয় হয়ে আগামী নির্বাচনে দলের নেত্রীকে জেতাতে ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তিন উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত সভা-সমাবেশের মাধ্যমে আগাম নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে বিএনপি। ওই সমাবেশে দলের নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ ভোটার ও এলাকাবাসীর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

ফেনী-১ আসনে জাসদের সাংগঠনিক ভিত্তি বরাবরই দুর্বল। তবে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে শিরীন আখতার ফেনী-১ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা গতি এসেছে। এমপির প্রতিনিধি হিসেবে ফেনী জেলা জাসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কাজী আবদুল বারী দলের কার্যক্রম গতিশীল করতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আবারো এই আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে উঠান বৈঠক, দলের বিভিন্নপর্যায়ের কমিটি গঠন, জোট ও দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণায় রয়েছে জাসদ। ১৪ দল থেকে শিরীন আখতারকে প্রার্থী দেয়া হতে পারে এমন আশায় নির্বাচনী গণসংযোগ করছে জাসদ। ১৪ দল থেকে যাকেই প্রার্থী দেয়া হোক তার পক্ষে জাসদ কাজ করবে এমনটাই জানান জাসদের নেতারা।

ফেনী-১ আসনে জামায়াতের শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি ও বড় একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। ২০ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ছাগলনাইয়া, পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের অসংখ্য নেতাকর্মীর নামে মামলা হয়েছে। শত বাধা-বিপত্তির পরও জামায়াত-শিবিরের সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রয়েছে।

এই আসন থেকে জামায়াত নেতা মরহুম আলহাজ মোহাম্মদ ইউনুছ কয়েকবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিগত বছরগুলোতে বেগম খালেদা জিয়া প্রার্থী হওয়ায় জামায়াত এই আসনে নিজেদের দলীয় প্রার্থী না দিয়ে জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। আগামী নির্বাচনে জামায়াত জোটগতভাবে নির্বাচন না করলে ওই আসনে ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী দিদারুল আলম মজুমদার জামায়াতের একক প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জামায়াতের ফেনী জেলা আমির এ কে এম সামছুদ্দিন জানান।

ফেনী-১ আসনে ৯০ দশকের শেষ দিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী লে. কর্নেল (অব:) জাফর ইমাম বীরবিক্রম ফেনীতে ব্যাপক আলোচিত ছিলেন। পরে জাফর ইমাম আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়ায় এই আসনে জাতীয় পার্টির আগের সেই অবস্থা নেই। সবশেষ জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ও ফেনী পৌরসভার মেয়র হাজী আলাউদ্দিন, আরেক প্রার্থী দলের ভাইস চেয়ারম্যান এ টি এম গোলাম মাওলা পদত্যাগের কারণে এলাকায় জাতীয় পার্টি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে।

ছাগলনাইয়া উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির ভূঁইয়া জানান, আগামী নির্বাচনে ওই আসন থেকে দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিশেষ উপদেষ্টা নাজমা আক্তার প্রার্থী হবেন। তবে এলাকার সাধারণ মানুষ ও দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মী তাকে কখনো দেখেনি।

ফেনী-১ আসন ধরে রাখতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা। বেগম খালেদা জিয়াই আবারো এই আসনে প্রার্থী হচ্ছেন এমনটি নিশ্চিত হয়েই তাকে বিজয়ী করতে আগাম প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে বিএনপি। তিন উপজেলায় প্রায় প্রতিদিনই নানা কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়েছে বিএনপি।


প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

 



আজকের প্রশ্ন

কিছু সহিংসতা ও অনিয়ম হলেও সামগ্রিকভাবে ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে—সিইসির এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি একমত?