সোমবার, ২১ মে ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

রবিবার, ০৬ মে, ২০১৮, ১২:০৮:০৯

আতঙ্কে থমথমে পাহাড়

আতঙ্কে থমথমে পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক: জেএসএস (এমএন লারমা) নেতা শক্তিমান চাকমা, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নেতা তপন জ্যোতি চাকমাসহ পৃথক ঘটনায় ছয়জনকে হত্যার পর তিন পার্বত্য জেলায় বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি। পাহাড়ের আদিবাসী এবং বাঙালিরা যে কোনো মুহূর্তে আরও বড় কোনো অঘটনের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

গত বৃহস্পতিবার রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরে শক্তিমানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা এবং গত শুক্রবার শক্তিমানের শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে আরও পাঁচজনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যার ঘটনা গোটা পার্বত্যাঞ্চলে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। কখন কোথায় কার লাশ পড়ে এ ভয় তাড়া করছে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের।
ভাতৃঘাতী এ সংঘর্ষ পাহাড়ে ব্যাপক প্রতিহিংসা ছড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। ইতোমধ্যে জুম্ম জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করা আঞ্চলিক দলগুলো একে-অপরকে দুষছেন এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য। বিশেষ করে জেএসএস (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দুই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করেছে ইউপিডিএফকে। আর ইউপিডিএফ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে তৃতীয় কোনো পক্ষ এ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। দুই ঘটনার পর অনেকে পার্বত্যাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। গত শুক্রবার থেকেই সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্কাবস্থানে রয়েছে।
এদিকে শুক্রবারের ব্রাশফায়ারের ঘটনায় নিহত হয়েছেন তপন জ্যোতিসহ অন্য নেতাকর্মীদের বহনকারী মাইক্রোবাসচালক সজীব হোসেন। সজীবের খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারসহ তিন দফা দাবিতে আগামীকাল সোমবার থেকে তিন পার্বত্য জেলায় ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ ও পার্বত্য নাগরিক পরিষদ। গতকাল শনিবার দুপুরে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত ফরাজি সাকিব এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
খাগড়াছড়ি উপজেলার মহালছড়ি থেকে অপহৃত তিন বাঙালিকে জীবিত উদ্ধার, সজীবের খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচার এবং জনসংহতি সমিতি, ইউপিডিএফসহ পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা। একই দাবিতে আজ রোববারও তিন পার্বত্য জেলায় কালো পতাকা মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করবে বলে ঘোষণা করেছে সংগঠন দুটি।
পাহাড়ে হঠাৎ অশান্তি ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পাহাড়ে শান্তির মধ্যে অস্থিরতা তৈরির জন্য মতলববাজ মহল সক্রিয় রয়েছে। গতকাল তিনি সুনির্দিষ্ট করে বলেছেন, পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টির পেছনে বিএনপি-জামায়াতের হাত রয়েছে। পাহাড়ে এ রক্তপাতের পেছনে বিএনপি-জামায়াত ঢুকে পড়ার ইঙ্গিত আমরা পেয়েছি।
অপরদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, পাহাড়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশবিরোধী ও শান্তি বিনষ্টকারী বেশ কয়েকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, জনগণ সচেতন, তারা জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় না। যে কোনো মূল্যে আমরা পাহাড়ের শান্তি রক্ষা করব। শান্তি বিনষ্ট হতে দেব না।
পাহাড়ে ৪৮ ঘণ্টা হরতালের ডাক
রাঙ্গামাটিতে সশস্ত্র হামলায় নিহত মাইক্রোবাসচালক সজীব হোসেনের খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারসহ তিন দফা দাবিতে তিন পার্বত্য জেলায় ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ ও পার্বত্য নাগরিক পরিষদ।
গতকাল শনিবার দুপুরে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত ফরাজি সাকিব এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। খাগড়াছড়ি উপজেলার মহালছড়ি থেকে অপহৃত তিন বাঙালিকে জীবিত উদ্ধার, সজীবের খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচার এবং জনসংহতি সমিতি, ইউপিডিএফসহ পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আগামীকাল সোম ও মঙ্গলবার তিন পার্বত্য জেলায় ৪৮ ঘণ্টার এ হরতাল ডাকা হয়েছে। একই দাবিতে আজ রোববার তিন পার্বত্য জেলায় কালো পতাকা মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে সংগঠন দুটি।
গত ১৬ এপ্রিল মহালছড়ি বাজারে কাঠ কিনতে গিয়ে মাটিরাঙ্গা উপজেলার নতুনপাড়া এলাকার মো. সালাহ উদ্দিন (২৮), মহরম আলী (২৭) ও আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা ট্রাকচালক বাহার মিয়া (২৭) নিখোঁজ হন। সর্বশেষ শুক্রবার জেএসএস (এমএন লারমা) নেতা শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের সশস্ত্র হামলায় নিহত হন মাইক্রোবাসচালক সজীব হোসেন। এ সময় ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতিসহ নিহত হয়েছেন আরও চারজন।
শাহাদাত ফরাজি সাকিব বলেন, জনসংহতি সমিতি, ইউপিডিএফসহ আঞ্চলিক দলগুলোর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পাহাড়ের মানুষ জিম্মি হয়ে আছে। এদের সন্ত্রাসী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে আমরা পার্বত্য তিন জেলায় এ কর্মসূচির ডাক দিয়েছি।
বেতছড়ি হত্যাকাণ্ডে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর
নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্যে যাওয়ার সময় রাঙ্গামাটির বেতছড়িতে গুলিতে নিহত পাঁচজনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে গত শুক্রবার রাতে তিনজন ও শনিবার দুপুরে দুজনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর হয় বলে খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি সাহাদাত হোসেন টিটো নিশ্চিত করেছেন।
গুলিতে নিহত নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্যে যোগ দিতে খাগড়াছড়ি থেকে নানিয়ারচর যাওয়ার পথে শুক্রবার রাঙ্গামাটির বেতছড়িতে গুলিতে পাঁচজন নিহত ও আটজন আহত হন। নিহতরা হলেন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা, জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) সমর্থিত যুব সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য সুজন চাকমা, মহালছড়ি শাখার সভাপতি তনয় চাকমা, সমর্থক রবিন চাকমা ও মাইক্রোবাস চালক সজীব হোসেন।
ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার রাতেই তনয় চাকমা, রবিন চাকমা ও সজীবের লাশ হস্তান্তর করা হয়। আর নিরাপত্তার কারণে তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা ও সুজন চাকমার মরদেহ খাগড়াছড়ি সদর থানায় রাখা হয়। গতকাল শনিবার দুপুরে পুলিশ প্রহরায় শহরের তেঁতুলতলায় স্বজনদের সহায়তায় তাদের লাশ দাহ করা হয়। হামলার পর শুক্রবার সন্ধ্যায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় বেতছড়ি থেকে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য আনা হয়।
সবুজ পাহাড়ে ৫ মাসে খুন ১৮
রাঙ্গামাটির সবুজ পাহাড়ে গত ৫ মাসে ১৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে, আহত হয়েছেন অনেকে। পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের শিকার হয়েছেন তারা। একের পর এক এসব হত্যাকাণ্ডে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে পাহাড়। এতে আতঙ্কে দিন পার করছেন পাহাড়ে বসবাসকারীরা।
গত বছরের ১ ডিসেম্বরে ঢাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়াম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা পাহাড়ে আবার আগুন জ্বালাবে। তার এ ঘোষণার চার দিন পরেই ৫ ডিসেম্বর নানিয়ারচর সতেরো মাইল ও আঠারো মাইলের মধ্যবর্তী চিরঞ্জীব দোজরপাড়া এলাকার নিজ বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়ে ইউপিডিএফ সমর্থক ইউপি সদস্য অনাধি রঞ্জন চাকমাকে (৫৫)। এ হত্যার জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করে অনাধি সমর্থিত দল ইউপিডিএফ (প্রসিত)।
ওই দিন রাঙ্গামাটির জুরাছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দ চাকমাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। তবে এ হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগ সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসকে দায়ী করে। এ ছাড়া ওই দিনই আবার বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি রাসেল মার্মাকে কুপিয়ে জখম করা হয়। একদিন পর ৭ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি শহরে নিজ বাসায় জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি ঝর্ণা খীসাকে কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে ১৬ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গায় ইউপিডিএফ কর্মী ও সংগঠক অনল বিকাশ চাকমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইউপিডিএফ (প্রসিত) এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করে।
এদিকে চলতি বছরের শুরুতেই ৩ জানুয়ারি বিলাইছড়ি উপজেলায় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্বরায় তংচঙ্গ্যাকে গুলি করা হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনার জন্য যুবলীগ জেএসএসকে দায়ী করে। ৩ জানুয়ারি খাগড়াছড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা মিঠুন চাকমাকে। একইভাবে ইউপিডিএফ এ হত্যার জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করেন।
৩০ জানুয়ারি বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের তিন কর্মীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। এ ঘটনাতেও জেএসএসকে দায়ী করেছেন আওয়ামী লীগ। পরে ১২ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটি শহরে ছাত্রলীগ নেতা সুপায়ন চাকমাকে মারধর করের পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ কর্মীরা। প্রতিবাদে রাঙ্গামাটিতে হরতাল পালন করে ছাত্রলীগ। ২১ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় সুভাষ চাকমা নামের একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনিও ইউপিডিএফ (প্রসিত) সমর্থিত কর্মী ছিলেন।
১৭ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি শহরের হরিনাথপাড়া এলাকায় ইউপিডিএফ (প্রসিত) কর্মী দীলিপ কুমার চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি ইউপিডিএফের হরিনাথপাড়ার সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১১ মার্চ বাঘাইছড়িতে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের (প্রসিত) কর্মী নতুন মনি চাকমাকে।
১৮ মার্চ রাঙ্গামাটির কুতুবছড়ি থেকে অপহরণ করা হয় ইউপিডিএফ (প্রসিত) সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে। প্রায় এক মাস পরে ১৯ এপ্রিল মুক্তি পান তারা দুইজন। এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করে ইউপিডিএফ (প্রসিত)।
১২ এপ্রিল পাল্টাপাল্টি হামলায় মারা যান রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় ইউপিডিএফের (প্রসিত) এক সদস্য। এ হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জেএসএসের (এমএনলারমা) দুই কর্মীকে হত্যা করা হয়। তারা হলেন- পঞ্চায়ন সাধন চাকমা (৩০) ও কালোময় চাকমা (২৯)।
১৬ এপ্রিল খাগড়াছড়ি শহরের পেরাছড়া এলাকায় সন্ত্রাসী হামলায় সূর্য বিকাশ চাকমা নামে একজন নিহত হন। তিনিও ইউপিডিএফর দুই গ্রুপের বিরোধের কারণে প্রাণ হারান। ২২ এপ্রিল খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার মরাটিলা এলাকায় ইউপিডিএফ ও জেএসএসের (এমএন লারমা) মধ্যে গোলাগুলিতে সুনীল বিকাশ ত্রিপুরা (৪০) নামে এক ইউপিডিএফ সমর্থিত কর্মী নিহত হন।
সর্বশেষ গত ৩ মে নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ে সামনে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেএসএস (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শক্তিমান চাকমাকে। এসময় তার সঙ্গে থাকা সংগঠনটির আরেক নেতা রূপম চাকমাও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এর একদিন পর ৪ মে শক্তিমান চাকমার দাহ্যক্রিয়ায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তের হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের শীর্ষ নেতা আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা। একই সঙ্গে দলটির নেতা সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা, তনক চাকমা এবং তাদের গাড়িচালক সজীব।
এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র তৎপরতা এবং বেপরোয়া হত্যার ঘটনাকে সরকার গুরুত্বসহকারে নিয়েছে। আমরা তৎপর রয়েছি, যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ কাজ করে যাবে। পাহাড়ের এ সংঘাত বন্ধে এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালানো হচ্ছে।

পাহাড়ে রক্তপাতে বিএনপি-জামায়াত: ওবায়দুল কাদের

রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের পাঁচ নেতাকর্মী নিহতের মাধ্যমে পাহাড়কে অশান্তির যে চেষ্টা চলছে সেখানে বিএনপি-জামায়াতের হাত আছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
গতকাল শনিবার দুপুরে চট্টগ্রামের এস এস খালেদ সড়কের লেডিস ক্লাবে মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত ‘তৃণমূলের বর্ধিত সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমন মন্তব্য করেন তিনি।
ওবায়দুল কাদের বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন এগিয়ে চলছে সেখানে হঠাৎ করেই পাহাড়ে লাশের রাজনীতি শুরু হয়েছে। পাহাড়ে এই রক্তপাতের পেছনে বিএনপি-জামায়াত ঢুকে পড়ার ইঙ্গিত আমরা পেয়েছি। তারা কোটা সংস্কারে ঢুকেও ব্যর্থ হয়েছিল। সেজন্য আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি রুখতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার বিজয় নিশ্চিতকরণ, সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী ও গতিশীল করার লক্ষ্যে এ সভার আয়োজন করা হয়েছে।
মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন।
এতে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী ডা. আফসারুল আমিন, খোরশেদ আলম সুজন প্রমুখ।

শান্তি বিনষ্টকারীদের খুঁজে বের করবই: আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল

পাহাড়ে শান্তি বিনষ্টকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, যারা পাহাড়ের শান্তি বিনষ্ট করতে চায়, যারা উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যাসহ ছয়জনকে হত্যায় জড়িত, তাদের খুঁজে বের করা হবে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর    পূর্তিতে ‘গৌরব ৭১’ শীর্ষক আলোচনা, গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গুণীজন সম্মাননা শীর্ষক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন তিনি।
রাজধানীর বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বাংলা দর্পণের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
পাহাড়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাহাড়ের শান্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী শান্তিচুক্তি করেছিলেন। শান্তিচুক্তির বিভিন্ন দফা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আরও কিছু দফা পূরণে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। গত পরশু এক জনপ্রতিনিধিকে হত্যা করা হয়েছে এবং তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার সময় শোকার্ত আরও পাঁচজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। যারা এ দুষ্কর্ম করেছেন তাদের আমরা খুঁজে বের করবই।
বাইরে থেকে এর আগেও পাহাড়ে গিয়ে অশান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা চলেছে, এবারও কি তাই?-এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাহাড়কে কেন্দ্র বাংলাদেশবিরোধী ও শান্তি বিনষ্টকারী বেশ কয়েকটি চক্র চেষ্টা করছে, তাদের খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণ সচেতন, তারা জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় না। যে কোনো মূল্যে আমরা পাহাড়ের শান্তি রক্ষা করব। শান্তি বিনষ্ট হতে দেব না।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপরে আঘাত
সৈয়দ আবুল মকসুদ
লেখক, গবেষক
পাহাড়ে হোক বা সমতলে হোক, এ জাতীয় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দার ভাষা নেই। বিষয়টি সরকারের জন্যও খুব বিব্রতকর। এতে প্রমাণিত হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে দীর্ঘদিন থেকে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত চলে আসছে। বিষয়টি রাজনৈতিক। রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার ওপর হামলার পর আরও পাঁচজনকে হত্যা জাতীয় জীবনে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনা। একই দিনে নরসিংদীর ইউপি চেয়ারম্যানকে খুন করা হয়েছে। এ দুটি হত্যাকাণ্ড স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপরে আঘাত। স্থানীয় সরকারেরই দায়িত্ব, নিজ নিজ এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা। সেখানে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই নিজেদের নিরাপত্তা দিতে পারছেন না। তার ফলে সাধারণ মানুষও অত্যন্ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ জাতীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উদ্ঘাটন করা সরকারের, প্রশাসনের জরুরি কর্তব্য। পাহাড়ে শান্তি বিনষ্টকারীদের শনাক্ত করে তাদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। তা না হলে সেখানকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে এবং তা প্রভাব ফেলবে আর্থসামাজিক জীবনে।

 

আজকের প্রশ্ন

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বিএনপির নেতারা মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি করছে। আপনিও কি তাই মনে করেন?