মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

সোমবার, ০৭ মে, ২০১৮, ১০:৪৭:০৬

যেভাবে বিদেশ থেকে বিএনপি চালাচ্ছেন তারেক রহমান

যেভাবে বিদেশ থেকে বিএনপি চালাচ্ছেন তারেক রহমান

ঢাকা: তারেক রহমান নিয়মিত ফোনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছেন, খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। এমনকি স্থায়ী কমিটির বিভিন্ন বৈঠকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মতামত দিচ্ছেন তারেক রহমান।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় দেশের বাইরে থেকে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি নিয়মিত ফোনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছেন, খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। এমনকি স্থায়ী কমিটির বিভিন্ন বৈঠকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মতামত দিচ্ছেন তারেক রহমান।

দীর্ঘদিন থেকেই তারেক রহমান দেশের বাইরে। অন্যদিকে ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলায় অনেকটাই হিমশিম খেতে হচ্ছে বিএনপিকে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, তারেক রহমান এখন বিএনপির পরিচালনায় রয়েছেন।

নেতারা দাবি করেন, দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দল পরিচালনার ক্ষমতা কেবল দুজনের। এর মধ্যে পরিচালনার একক ক্ষমতা চেয়ারপারসনের। তবে গঠনতন্ত্রের ৫(গ) ধারামতে, চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে এই ক্ষমতা দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতার। তাই খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপি চলছে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শক্রমে। জ্যেষ্ঠ নেতারা কেবল সমন্বয়কের দায়িত্ব পলন করছেন।

বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করলেও নিয়মিত দেশে দলের আস্থাভাজন ও সাংগঠনিক নেতাকর্মী, এমনকি জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন। খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর সেই যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, তারেক রহমান নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে বিএনপির যে সব নেতাকর্মী গুম-খুন-হত্যার শিকার হয়েছেন, যারা জেলে রয়েছেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকের পরিবারের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলছেন, যোগাযোগ রাখছেন। বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও পরামর্শ দিচ্ছেন। কাউকে কাউকে আর্থিক অনুদান ও আইনি সহযোগিতার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন।

তারেক রহমানের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে পেরে তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও অনেকটাই উচ্ছ্বসিত। ঢাকা, টাঙ্গাইল, সাতক্ষীরা, মাদারীপুর, বগুড়া, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্প্রতি তারেক রহমান মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন। তারেক রহমান ফোন করেছেন, এমন অন্তত চারজনের সঙ্গে প্রিয়.কমের কথা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘অতি সম্প্রতি হঠাৎ করে তারেক রহমান আমায় কল করে শারীরিক ও রাজনৈতিক বিষয়াদি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন। তিনি এই মুহুর্তে দেশে নাই, তারপরও তার প্রতিটি কথা ছিল বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষকে ঘিরে। তিনি বিদেশে বসেও বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার নিয়ে প্রতিনিয়ত ভাবছেন এবং আগামী দিনে বাংলাদেশকে সবার জন্য বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে অগ্রসর হতে পরামর্শ দিয়েছেন।’

খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের গণমাধ্যম শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) কারান্তরীণ হওয়ার পর থেকে দলের সিনিয়র নেতারা যতগুলো বৈঠক-মতবিনিময় করেছেন, প্রতিটি বৈঠক-মতবিনিময়ে তারেক রহমান ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলছেন, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন। এককথায় দলের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শক্রমে। খালেদা জিয়া জেলে থাকার পরও গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিতে নেতাকর্মীদের মধ্যে মতের অমিল ছিল। কিন্তু তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে সে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন তারা। এমনকি তারেক রহমান দলের বাইরের জোট ও দেশের বরেণ্য রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও কথা বলছেন।’

গত এপ্রিল মাসে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে কথা বলেছেন তারেক রহমান—এমন উদাহরণও টানেন ওই কর্মকর্তা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে, তারেক রহমান লন্ডনে, তারপরও বিএনপিতে কোনো সংকট নেই। নেই নেতৃত্ব সংকট। যার বড় প্রমাণ সরকার শত চেষ্টা করেও বিএনপিতে ফাটল ধরাতে পারেনি। একেক সময় একেক ধরনের অপপ্রচারের খেলায় সরকারের এমপি-মন্ত্রীদের মেতে উঠতে দেখা যায়। তবে আমরা মনে করি আইনি লড়াইয়ে খালেদা জিয়া শিগগির মুক্তি পাবেন। এ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শে স্থায়ী কমিটির সমন্বিত সিদ্ধান্তে বিএনপি পরিচালিত হচ্ছে, হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘খালেদা জিয়ার নির্দেশনা অনুযায়ী দলের জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দল পরিচালনা করছেন তারেক রহমান। দল আগের চেয়ে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ। প্রায় প্রতিনিয়তই দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তারেক রহমানের যোগাযোগ হচ্ছে। তার নেতৃত্বের ব্যাপারে দলটির তরুণদের মধ্যেও ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। কারণ তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে তারেক রহমানের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।’

সম্প্রতি বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, এবারে নির্বাচন হবে। কমিউনিষ্ট পার্টিও আসবে, এমনকি বাম মোর্চা যারা সব সময় নির্বাচনের বাইরে ছিল, তারাও আসবে। শুধু তাই নয়, খালেদা জিয়া জেলে থাকলেও বিএনপি নির্বাচনে আসবে। তখন তারা (বিএনপি) বলবে, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্যই তারা নির্বাচনে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘খালেদা জিয়া শিগগিরই জামিনে মুক্তি পাবেন। এরপর সবকিছু তার নির্দেশেই পরিচালিত হবে। এখন যেহেতু তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে হাইকোর্টের বিধিনিষেধ আছে। স্বাভাবিকভাবেই তার পক্ষে সরাসরি কিছু করা সম্ভব হবে না। তাই চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জামিনে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমানই দলের মূল পরামর্শক থাকবেন, তার পরামর্শই বাস্তবায়ন করবে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এবং সংগঠন পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মাঠপর্যায়ে তাকে সহযোগিতা করবেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।’

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে বিএনপিকে সরকার বিপদে ফেলেছে এবং দলের নেতারা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলে দলের ক্ষতি হবে।’

জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপিকে তাদের নেতা হিসেবে খালেদা জিয়াকে সামনে রাখতে হবে। কোনোভাবেই খালেদা জিয়ার চেয়ে তারেক রহমানকে বড় নেতা বানানো যাবে না। সেটা সাময়িক সময়ের জন্য হলেও তা বিএনপির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’

এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘দলীয় গঠনতন্ত্র মোতাবেক তারেক রহমান বিএনপির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা। যেহেতু চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে একটি মিথ্যা-বানোয়াট মামলায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে, সেহেতু দল পরিচালনায় অটোমেটিক্যালি তারেক রহমান সাময়িক সময়ের জন্য হলেও সর্ব্বোচ নেতা।’

এক প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপিতে কোনো দ্বন্ধ বা মতানৈক্য নাই। বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল, তাই জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে জনগণের অধিকারের প্রশ্নে সময়মতো সিদ্ধান্ত থাকবে।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার পর পুরান ঢাকার সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। একই মামলায় তারেক রহমানও একই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত। এর আগে অর্থপাচারের একটি মামলায় হাইকোর্ট তারেক রহমানকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়। এ ছাড়া ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলা, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ অনেক মামলার আসামি তারেক। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে লন্ডনে রয়েছেন তারেক রহমান। ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনীতি ছাড়ার শর্তে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান তারেক রহমান। পরে ভিসার মেয়াদ শেষে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা জানিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আদালতে আবেদন করেন এবং সেটি মঞ্জুর হয়।


প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

 

 

এই বিভাগের আরও খবর

আজকের প্রশ্ন

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন ‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে বিএনপির নেতারা মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি করছে। আপনিও কি তাই মনে করেন?