মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ,২০১৮

Bangla Version
  
SHARE

মঙ্গলবার, ০৯ অক্টোবর, ২০১৮, ০৯:৪৯:১১

প্রতি জিবিতে ৩০০ গুণ মুনাফা করছে মোবাইল কোম্পানিগুলো

প্রতি জিবিতে ৩০০ গুণ মুনাফা করছে মোবাইল কোম্পানিগুলো

ঢাকা : ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের যাত্রা শুরু। কালের পরিক্রমায় ভয়েস সেবার পাশাপাশি ইন্টারনেট ডাটা সেবা দিয়ে আসছে মোবাইল অপারেটরগুলো।

বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় সবথেকে কম মূল্যে ইন্টারনেট কেনার পরেও গ্রাহক পর্যায়ে সেই ইন্টারনেটের দাম প্রশ্নবিদ্ধ। পয়সায় কেনা প্রতিজিবি ইন্টারনেট গ্রাহকের কিনতে হয় শত টাকায়। তবুও আনলিমিটেড এবং সাশ্রয়ী মূল্যে মাসব্যাপী ইন্টারনেট ডাটা প্যাকেজ নেই কোনো অপারেটরেরই।

ইন্টারনেট কেনার খরচ

মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো (রবি, এয়ারটেল, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, টেলিটক) দেশের আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ইন্টারনেট ডাটা কিনে থাকে। প্রতিষ্ঠানভেদে প্রতি সেকেন্ডে সর্বনিম্ন ৩৮০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকায় ১ মেগাবিট ব্যান্ডউইথের ইন্টারনেট ডাটা কেনে অপারেটরগুলো।

সেই হিসেবে (১*৬০*৬০*২৪*৩০=২৫৯২০০০ মেগাবিটি) মাস শেষে ডাটার পরিমাণ দাঁড়ায় দুই হাজার ৫৯২ গিগাবিট (জিবি)। অর্থ্যাৎ প্রতি জিবি ইন্টারনেট কিনতে অপারেটরগুলোর খরচ হয় প্রায় ১৫ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ২৭ পয়সা।

এর সঙ্গে ‘ডাটা প্যাকেট লস’ হিসেব করলেও প্রতিজিবি ইন্টারনেটের দাম ৫০ পয়সাও অতিক্রম করে না।

গ্রাহক পায় যে দামে

চতুর্থ প্রজন্মের নেটওয়ার্ক ফোর-জি’তে গ্রামীণফোন তাদের গ্রাহকদের কাছে ১.৫ জিবি (১৫৩৮ এমবি) ইন্টারনেট বিক্রি করে ২২৯ টাকায়। সেটির মেয়াদ মাত্র ২৮ দিন। ৩০দিন মেয়াদি একটি প্যাকেজ আছে গ্রামীণফোনের। ১১৫ এমবি ইন্টারনেটের সেই প্যাকেজের দাম ৫৬ টাকা।

৪.৫ জি নেটওয়ার্ক দাবি করা মালয়েশিয়াভিত্তিক আজিয়াটা গ্রুপের মোবাইল অপারেটর রবি এর ৩০ দিনব্যাপী ইন্টারনেট প্যাকেজের সর্বনিম্ন মূল্য ৩১৬ টাকা। এতে পাওয়া যাবে ২জিবি ইন্টারনেট। অর্থ্যাৎ গড়ে প্রতি জিবি ইন্টারনেটের মূল্য দাঁড়ায় ১৫৮ টাকা।

রবি’র সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করা আরেক অপারেটর এয়ারটেলে ২৮ দিন মেয়াদে ২ জিবি ইন্টারনেটের মূল্য ২২৯ টাকা। অর্থ্যাৎ প্রতিজিবি ইন্টারনেটের দাম পরে প্রায় ১১৬ টাকা। আর বাংলালিংকের ১.৫ জিবি ইন্টারনেটের মূল্য ২০৯ টাকা; মেয়াদ ৩০ দিন।

এই হিসেবে অপারেটরগুলোতে প্রতি জিবি ইন্টারনেটের জন্য গ্রাহকদের গুণতে হয় সর্বনিম্ন ১১৫ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। অর্থ্যাৎ প্রতি জিবি ইন্টারনেটের ক্রয়মূল্যের থেকে বিক্রয়মূল্য প্রায় ৩০০ গুণ।

তবে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটক এখনও ফোর-জি সেবা চালু করেনি।

মুনাফা

মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো তাদের গ্রাহকদের কাছে দুই ধরণের পণ্য বিক্রি করে আসছে। একটি হচ্ছে ‘ভয়েস’ এবং অপরটি হচ্ছে ‘ডাটা’। একই স্পেকট্রাম দিয়েই ভয়েস ও ডাটা গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো।

২০১৩ সালে থ্রী-জি আসার পর থেকেই বাংলাদেশের মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে ইন্টারনেট ডাটার ব্যবহার দিন দিন বাড়তে থাকে। প্রায় ১৫ কোটি মোবাইল গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৮ কোটি ৪৬ লাখ ব্যবহারকারী মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

আর এই সুযোগে একই জিনিস একই গ্রাহক শ্রেণীর কাছে দু’ভাবে বিক্রি করে বাড়তি মুনাফা গুণে নিচ্ছে অপারেটরগুলো।

বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে ইন্টারনেট ডাটা থেকে গ্রামীণফোনের আয় হয় এক হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। রবি আয় করে ৬৮৪ কোটি টাকা আর বাংলালিংকের আয় ৪৯৩ কোটি টাকা।

গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতি অনুযায়ী, চলতি ২০১৮ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত গ্রামীণফোনের মোট মুনাফা এক হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এই সময়ে ডাটা থেকে অর্জিত রাজস্বের প্রবৃদ্ধির হার ছিলো আগের বছরের প্রথমার্ধের তুলনায় ২১.১ শতাংশ বেশি। যেখানে ভয়স থেকে প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ২.৪ শতাংশ।

অন্যদিকে আরেক শীর্ষ অপারেটর রবি চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে লোকসানে থাকলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইন্টারনেটে প্রবৃদ্ধির হার ৪২ শতাংশ। আর ভয়েস কলে প্রবৃদ্ধির হার ৫.২ শতাংশ।

অর্থ্যাৎ উপরের পরিসংখ্যান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ইন্টারনেট ডাটা বিক্রি করে মোটা অংকের মুনাফা পকেটে পুরছে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো। তবে এত মুনাফার পরেও বাংলাদেশের গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেটের মূল্যে ইতিবাচক কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইন্টারনেটের ওপর কর কমানোর সরকারি সিদ্ধান্তেরও কোনো সুফল পাচ্ছে না গ্রাহকেরা।

বরং গত সেপ্টেম্বর মাসেই বাড়ানো হয়েছে ভয়েস কলের মূল্য। এতকিছুর পরেও  গ্রাহকদের জন্য কোনো ‘আনলিমিটেড’ প্যাকেজ দিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। অথচ এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ইন্টারনেট গ্রাহকদের ব্যবহৃত মাসিক ইন্টারনেট ডাটার পরিমাণ গড়ে মাত্র ১২জিবি।   

দেশের অন্যতম শীর্ষ আইআইজি লাইসেন্স অপারেটর ফাইবার অ্যাট হোম গ্লোবালের গ্লোবাল বিজনেস বিভাগের প্রধান লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মশিউর রহমান (অব.) এ বিষয়ে বলেন, ‘ডাটা বলেন অথবা ভয়েস; এই দু’টি একই স্পেকট্রাম থেকে আসে। অর্থ্যাৎ মোবাইল অপারেটরগুলো একই তরঙ্গের দু’টি ইন্টারফেসকে দু’টি ফরম্যাটে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্যাকেজ যদি আপনি দেখেন তাহলে দেখবেন অপারেটরগুলো ডাটার সঙ্গে ‘ভয়েস’ বিনামূল্যে দেয়। অর্থ্যাৎ আপনি মুঠোফোনে সাধারণ ফোন কলের মাধ্যমে বিনামূল্যে কথা বলতে পারবেন। আপনাকে শুধু ডাটার জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হবে। আর সেই ডাটা ও অর্থের পরিমাণ যদি আমাদের দেশের সঙ্গে তুলনা করেন তাহলে দেখবেন যে, এখনও আমাদের দেশে ইন্টারনেট ও কলরেটের দাম বেশি।’

মশিউর রহমানের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে ইন্টারনেটে ভারতের একটি মোবাইল ফোন অপারেটর জিও ফোনের প্যাকেজ মূল্য যাচাই করে এই প্রতিবেদক। সেখানে ভারতীয় ১৪৯ রুপিতে (বাংলাদেশি টাকায় ১৬৯টাকা) ২৮ দিন মেয়াদে ৪২ জিবি ইন্টারনেটের একটি প্যাকেজের তথ্য পাওয়া যায়। এই প্যাকেজে সাধারণ ভয়েস কল একবারেই বিনামূল্যে পাওয়া যাবে। আর রোজ ১০০টি এসএমএসও বিনামূল্যে দিচ্ছে অপারেটরটি। সেই হিসেবে প্রতিজিবি ইন্টারনেটের দাম আসছে বাংলাদেশি মুদ্রায় মাত্র ৪টাকার একটু বেশি।

ব্রডব্যান্ড বনাম মোবাইল ইন্টারনেট

গত ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি পাঁচ লাখ। এদের ৮৮ শতাংশই (৮ কোটি ৪৬ লক্ষ) মোবাইল ফোন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। আর ওয়াইম্যাক্স ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাত্র ১২ শতাংশ।

অথচ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের মূল্য মোবাইল ইন্টারনেটের থেকে কম। একইসঙ্গে আনলিমিটেড প্যাকেজ আছে ব্রডব্যান্ডে যা নেই মোবাইল ইন্টারনেটে। খোদ রাজধানী ঢাকায় মাত্র ৫০০ টাকায় ৩ এমবিপিস শেয়ারড ব্যান্ডউইথের আনলিমিটেড ইন্টারনেট প্যাকেজ দেয় ব্রডব্যান্ড আইসপি’গুলো।

বিটিআরসি’র হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যবহৃত ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের পরিমাণ ৬৭২ জিবি। এর মধ্যে মোবাইল অপারেটরগুলো ব্যবহার করে প্রায় ২০০জিবি ব্যান্ডউইথ। অর্থ্যাৎ ৮৬ শতাংশ গ্রাহকের জন্য অপারেটরগুলো ব্যান্ডউইথ খরচ করে মাত্র ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। তবুও ইন্টারনেটের মূল্য যেমন বেশি অপারেটরগুলোতে, তেমনি ডাটার পরিমাণ কম।   

এসব বিষয়ে মোবাইল টেলিকম অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অফ বাংলাদেশের (অ্যামটব) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি সংগঠনটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন নেতা। একই সঙ্গে মোবাইল অপারেটরগুলোর সঙ্গে পৃথক পৃথকভাবে ইটিভি অনলাইনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি প্রতিষ্ঠানগুলো। ই-মেইলের মাধ্যমে ইন্টারনেটের দাম, মেয়াদ, ডাটার পরিমাণসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সেসব বিষয়েও কোন ব্যাখ্যা দেয়নি অপারেটরগুলো।

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?