বুধবার, ০৮ এপ্রিল ,২০২০

Bangla Version
  
SHARE

বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২০, ০৯:৩৯:০২

ওয়ালটনের শেয়ারমূল্যে কারসাজি, সর্বোচ্চ দাম প্রস্তাব করেছে সবচেয়ে দুর্বল প্রতিষ্ঠান

ওয়ালটনের শেয়ারমূল্যে কারসাজি, সর্বোচ্চ দাম প্রস্তাব করেছে সবচেয়ে দুর্বল প্রতিষ্ঠান

ঢাকা: শেয়ারবাজারে আসার জন্য অপেক্ষমাণ দেশীয় ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি ওয়ালটন হাইটেকপার্কের বিডিংয়ে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। বাজারে সবচেয়ে নতুন ও দুর্বল মার্চেন্ট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ওয়ালটনের সর্বোচ্চ দাম প্রস্তাব করেছে।

এ প্রতিষ্ঠানটি ওয়ালটনের ১০ টাকার শেয়ার ৭৬৫ টাকায় কেনার প্রস্তাব করে। তাও আবার মাত্র ১০০টি শেয়ার। অর্থাৎ মোট টাকার অঙ্কে তারা শেয়ার কিনবে মাত্র ৭৬ হাজার ৫০০ টাকার। শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা এ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না।

তাদের মতে, এখানে এক পক্ষকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতে এভাবে পূর্বপরিকল্পিতভাবে কারসাজির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এই উচ্চ দর প্রস্তাবের কারণে ৩১৫ টাকা কাট অফ প্রাইস নির্ধারণ হয়েছে। তারা মনে করেন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বিতর্কিত এই বিডিং বাতিল করা জরুরি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিঙ্গারের মতো বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। বুধবার এই কোম্পানির শেয়ারের দাম ছিল ১৫৭ টাকা। সেখানে ওয়ালটনের মতো নতুন একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম ৭৬৫ টাকা প্রস্তাব করা কোনোভাবে যৌক্তিক নয়।

এদিকে অভিযুক্ত ইসলামী ব্যাংক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুর রহিম বুধবার বলেন, এটি তাদের আসল দাম নয়। তারা এই শেয়ারের দাম মাত্র ৮৫ টাকা প্রস্তাব করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিডিংয়ের দিন তিনি অফিসের বাইরে ছিলেন।

এ ক্ষেত্রে যিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন, তার ভুলে এটি হয়েছে। পরে বিডিং চলাকালীন বিষয়টি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) অবহিত করা হয়েছে। দামটি সিস্টেমে উঠে যাওয়ায় তারাও আর পরিবর্তন করতে পারেনি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানটি একেবারে নতুন। গত বছরের সেপ্টেম্বর চালু হয়েছে। এখনও জনবল নিয়োগ দেয়া শেষ হয়নি। যে কারণে অনেক কিছুই বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি।’

জানতে চাইলে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, বিডিংয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ওয়ালটনের শেয়ারের যে মূল্য প্রস্তাব করেছে, সেটি স্বাভাবিক মনে হয়নি। কারণ, বাজারের যে বর্তমান অবস্থা তাতে কোনোভাবেই এ মূল্য গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, আইপিওতে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারমূল্য নির্ধারণের যৌক্তিক কয়েকটি মানদণ্ড রয়েছে।

এই মানদণ্ডের বাইরে যে অতিরিক্ত মূল্য এসেছে, সেটি বাতিল হওয়া উচিত। পাশাপাশি যারা এ ধরনের অস্বাভাবিক মূল্য প্রস্তাব করেছে, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তা না-হলে বিনিয়োগকারীরা অযৌক্তিক মূল্যে শেয়ার কিনে ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে শেয়ারবাজারে ৪ হাজার পয়েন্টে নেমে এসেছে সূচক। বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দামও তলানিতে। এ অবস্থায় কীভাবে এই উচ্চ দর প্রস্তাব করল তার কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না।

প্রসঙ্গত, ব্যবসা সম্প্রসারণ, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের খরচ মেটাতে পুঁজিবাজার থেকে ১০০ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য সম্প্রতি আবেদন করে ওয়ালটন। তবে ১০ টাকার শেয়ারের বিপরীতে প্রিমিয়াম কত হবে, তা বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে নির্ধারণ হয়।

সেখানে মূল্য প্রস্তাবে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা গেছে। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ১০ টাকার শেয়ারের দাম কোনো প্রতিষ্ঠান ১২ টাকা প্রস্তাব করেছে, আবার কেউ প্রস্তাব করেছে ৭৬৫ টাকা। এটি স্বাভাবিক নয়। যে কারণে বাজারে ওয়ালটনের শেয়ারমূল্য নিয়ে নানা সন্দেহ ও সমালোচনা চলছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি ছায়েদুর রহমান বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠান ওয়ালটনের শেয়ারের যে মূল্য প্রস্তাব করেছে, তা যৌক্তিক নয়। কারণ, বর্তমানে সামগ্রিকভাবে বাজারের মূল্য আয়ের অনুপাত (পিই রেশিও) ১০-১১-র মধ্যে। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যে প্রস্তাব করেছে, তা ২৫। এই বাজারে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা লাভের জন্য শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন। সেখানে লাভের সুযোগ না থাকলে কেউ বিনিয়োগ করবেন না।

জানা গেছে, ওয়ালটনের বিডিংয়ে ৩১৫ টাকা কাট অফ প্রাইস নির্ধারণে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দর প্রস্তাবকারী যোগ্য বিনিয়োগকারী হচ্ছে অ্যাগ্রো গার্ডেন এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড। এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিটি শেয়ার ৬৮৪ টাকা করে ১৪ হাজার ৬০০ শেয়ার নেয়ার জন্য দর প্রস্তাব করা হয়।

যার মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইউনাইটেড সিকিউরিটিজ থেকে ৬৪১ টাকা করে দর প্রস্তাব করা হয়। এই দরে মোট ১৪ হাজার ৬০০ শেয়ার নেয়া হবে। ওয়ালটনের ৩১৫ টাকা কাট অফ প্রাইস নির্ধারণে গ্রুপ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে আইডিএলসি।

এই গ্রুপের ৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৬২৫ টাকা করে দর প্রস্তাব করা হয়। এর বাজারমূল্য ধরা হয় ৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া আইডিএলসির আরও ৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৪১১ টাকা করে প্রায় আড়াই কোটি টাকার দর প্রস্তাব করা হয়। নিয়ম অনুসারে, প্রস্তাবিত দরে শেয়ার কিনতে হবে যোগ্য বিনিয়োগকারীকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেয়ারবাজার অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গা। এখানে যে কোনো কিছু কোম্পানির শেয়ারমূল্যে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের চারজন মন্ত্রীকে দিয়ে ওয়ালটন কারখানা পরিদর্শন করানো হয়েছে। এর মধ্যে গত ১ মার্চ গাজীপুরের চন্দ্রায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ওয়ালটনের কারখানা পরিদর্শন করেন। এ সময়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক সঙ্গে ছিলেন। এ ছাড়া ৭ মার্চ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ওয়ালটনের কারাখানা পরিদর্শন করেন।

এ সময়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর স্ত্রী আইরীন মালবিকা মুনশি সঙ্গে ছিলেন। মন্ত্রীদের এই পরিদর্শন কোম্পানির মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এর আগে ২০০৬ সালে সৌদি যুবরাজ রূপালী ব্যাংক কিনে নিচ্ছেন- এমন খবর চাউর হওয়ায় রাতারাতি প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ৪০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায় উঠেছিল।

তাই যখন কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসে তখন অনেকে এ ধরনের পরিকল্পিত শোডাউন করে থাকে। যা হয়তো আমন্ত্রিত অতিথিদের পক্ষে জানা সম্ভব হয় না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যারা শেয়ারবাজার মনিটরিং করেন তাদের এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

এদিকে ওয়ালটন হাইটেকপার্কের আর্থিক রিপোর্ট পর্যালোচনা করে বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। শেয়ারবাজারে দেয়া কোম্পানির প্রসপেক্টাসের তথ্য অনুসারে বিস্ময়করভাবে আগের বছরের চেয়ে শুধু ২০১৮-১৯ অর্থবছরেই তাদের মুনাফা ২৯০ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।

আলোচ্য সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে। আগের বছর যা ছিল ৩৫২ কোটি টাকা। অথচ পণ্য বিক্রি বৃদ্ধির হার দেখানো হয়েছে ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মানে হল- পণ্য বিক্রি কম, কিন্তু মুনাফা অনেক বেশি, যা সাংঘর্ষিক ও অস্বাভাবিক।

কিন্তু এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তাদের মুনাফা ৫২ শতাংশ এবং টার্নওভার ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছিল। অন্যদিকে কোম্পানির মুনাফা বাড়লেও একই বছরে কোম্পানির ক্যাশ ১০২ কোটি টাকা কমেছে। শতকরা হিসাবে যা ৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

একই সময়ে কোম্পানির বিক্রি এবং রিসিভাবল আয়ের মধ্যে ১ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা পার্থক্য রয়েছে। এর মানে হল- কোম্পানি বেশিরভাগ পণ্যই বাকিতে বিক্রি করেছে। তাদের বেশিরভাগ পণ্যই ওয়ালটন হাইটেকপার্কের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন প্লাজার কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

কোম্পানির প্রসপেক্টাসে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আলোচ্য বছরে ৫ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা টার্নওভার ছিল প্রতিষ্ঠানটির। আগের বছর যা ছিল ২ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। এর মানে হল- ১২ মাসের ব্যবধানে কোম্পানির টার্নওভার ২ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা বেড়েছে। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৮-১৯ সালে ৭২ দশমিক ৫২ শতাংশ রিফ্রিজারেটর বিক্রি হয়েছে। টাকার অঙ্কে যা ১ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা অবিশ্বাস্য।

আজকের প্রশ্ন

বিএনপির নেতারা আইন না বুঝেই মন্তব্য করে আইনমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে আপনি কি একমত?