বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারী ,২০১৭

Bangla Version
SHARE

শুক্রবার, ০৬ জানুয়ারী, ২০১৭, ০৩:০৬:৫৭

বিএনপির ভিশন-২০৩০ লাপাত্তা

বিএনপির ভিশন-২০৩০ লাপাত্তা

ঢাকা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি গত বছরের ১৯ মার্চ তাদের জাতীয় সম্মেলনে ঘটা করে ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা দিলেও এর কোনো কার্যক্রম নেই। দলীয়প্রধান এ ভিশন চূড়ান্ত করতে না পারায় বিষয়টি প্রায় লাপাত্তা। কী পর্যায়ে আছে কেউ জানে না। অন্যদিকে ষষ্ঠ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় সাড়ে ৫ মাস পর ৫০২ সদস্যের  ঢাউস সাইজের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষিত হলেও আজ পর্যন্ত ঘোষিত হয়নি স্থায়ী কমিটির ৩টি শূন্য পদ। এর মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহ মারা যাওয়ায় একটি পদ শূন্য হয়েছে, বাকি দুই স্থায়ী সদস্যের নামই ঘোষণা করা হয়নি।
সম্পাদকীয় পদ ঘোষণার বাকি আছে ৪টি। ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক, যুববিষয়ক সম্পাদক এবং তাদের দুই সহ-সম্পাদক। ঢাউস সাইজ কমিটি হলেও নেতানেত্রীদের মধ্যে নেতৃত্বের কোন্দল মেটেনি। সম্মেলনের ৯ মাস হয়ে গেলেও স্থবিরতা কাটাতে পারেনি দলটি। দলের অনেক নেতাকর্মী মনে করেন, এবারো তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ-হতাশা।
‘এক নেতা এক পদ’-এই নীতিতে এবারের কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও অনেক নেতাই এখনো কয়েক পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। একই সঙ্গে ৩ দফা উদ্যোগ নেয়ার পরও সারাদেশে দলটির ভেঙে দেয়া ৭৮টি সাংগঠনিক কমিটির খুব অল্পই পুনর্গঠন হয়েছে। ১১টি অঙ্গ দলের মাত্র দুটি স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দল ছাড়া বাকিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ। দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, এসব কারণেই দলে চাঙ্গাভাব ফিরে আসছে না। আন্দোলন-সংগ্রামে লোক পাওয়া যাচ্ছে না।  
এ ব্যাপারে জানতে  চাইলে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য (অবসরপ্রাপ্ত) লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান। তিনি মানবকণ্ঠকে জানান, কাউন্সিল শেষ হওয়ার পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে একটু বেশি সময় নেয়া হয়েছে সত্য কিন্তু কমিটি সুন্দর হয়েছে। বিএনপি একটি বড় দল। এখানে সবাইকে নেতৃত্বে ‘অ্যাকোমুডেট’ করা হয়তো সম্ভব নয়। তা ছাড়া অনেকে আবার মনমতো পদ পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, বিএনপির মতো বড় দলে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবেই। কোন্দলও কিছুটা থাকতে পারে। তবে দল আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় সুসংগঠিত।
দল পুনর্গঠন সম্পর্কিত বিষয়ে মাহবুব বলেন, এটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে সংখ্যা বলতে না পারলেও অনেক জেলা কমিটিই পুনর্গঠন করা হয়েছে দাবি করেন তিনি।  
বিএনপির জেলা বা ইউনিট কমিটিগুলো গেল ডিসেম্বরে সম্পন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, দলের ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠন চলছে। এসবের বেশিরভাগ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
সারা দেশে বিএনপির ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার বেশিরভাগ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর তৃণমূলের অনেকে কেন্দ্রীয় কমিটিতেও পদ পেয়েছেন। ফলে জেলা কমিটিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদ ‘শূন্য’ রয়েছে। এ অবস্থায় দলকে গতিশীল করতে এবং আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে আরো বেশি সক্রিয় করতে দ্রুত জেলা সম্মেলনগুলো শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি।
প্রথমে গেল বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে এবং পরে ডিসেম্বরের মধ্যে এসব কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপরও সব কমিটি করা যায়নি। এ কারণে এখন চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে এসব কমিটি গঠনের কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির কমিটি গঠন কাজ সম্পর্কিত বিষয়াদির প্রধান সমন্বয়কারী দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান মানবকণ্ঠকে বলেন, ইতিমধ্যে ৪০টি সাংগঠনিক কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। বাকি ২০ থেকে ২২টি কমিটি পুনর্গঠন করা হবে খুব শিগগির। বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে করা হবে।
কমিটি পুনর্গঠন কাজ দেরি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মূলত প্রশাসনের বাধার মুখে আমরা বিভিন্ন জেলায় সম্মেলন করতে পারিনি। এক স্থানে সমবেত হলেই প্রশাসন আমাদের ওপর চড়াও হয়েছে।  তিনি বলেন, খুলনা, বরিশাল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম জেলা, ময়মনসিংহ ও নরসিংদীসহ আরো বেশ কয়েকটি জেলা কমিটি গঠনের কাজ সহসাই শেষ হবে।
এদিকে ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে যে ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করেছিলেন দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, তা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত রূপ পায়নি। খালেদা জিয়া সেদিন তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘সকলের সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে সমৃদ্ধ দেশ ও আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে বিএনপি ইতিমধ্যেই একটি বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রণয়ন করেছে। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই, অচিরেই এই ভিশন-২০৩০ চূড়ান্ত করা হবে।’
ভিশনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে এক. বাংলাদেশের জনগণের সব ধর্মাবলম্বী গোষ্ঠী, নৃ-গোষ্ঠী, পাহাড় ও সমতলবাসীসহ সবাইকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে একটি ‘রেইনবো নেশন’ গড়ে তোলা, দুই. প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা, তিন. রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণœ রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সম্প্রদায়, প্রান্তিক গোষ্ঠী ও পেশার জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদে একটি উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে, চার. জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সম্মতি গ্রহণের পন্থা ‘রেফারেন্ডাম’ বা ‘গণভোট’ ব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃপ্রবর্তন করা।
‘ভিশন-২০৩০’ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য (অবসরপ্রাপ্ত) লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান অজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন বলেন, খালেদা জিয়ার ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’-এর খসড়ার চূড়ান্ত রূপের ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। তবে তিনি বলেন, ভিশন চূড়ান্ত করার জন্য হয়তো কাজ চলছে।
বিএনপির ১১ অঙ্গ সংগঠন: বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন অনেকটা বেহাল হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ সংগঠনের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। এগুলোতে কেউ কারো নেতৃত্ব মানছেন না। মতবিরোধ ও অসন্তোষ বাড়ছে। ইতিমধ্যে শফিউল বারী বাবুকে সভাপতি ও আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দল এবং আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে মহিলা দলের কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।  
যুবদল: ২০১০ সালের ১ মার্চ সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে সভাপতি এবং সাইফুল আলম নীরবকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে মামুন হাসানকে সভাপতি এবং এস এম জাহাঙ্গীরকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্যবিশিষ্ট ঢাকা মহানগর উত্তর এবং হামিদুর রহমান হামিদকে সভাপতি ও রফিকুল আলম মজনুকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্যবিশিষ্ট নগর দক্ষিণের কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া ২১১ সদস্যবিশিষ্ট যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করেন। বর্তমানে ২৭১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি রয়েছে। যুবদলের কমিটির মেয়াদ ৩ বছর। তবে ছয় বছরেরও অধিক সময় ধরে সংগঠনটির বর্তমান কমিটি (কেন্দ্রীয় ও মহানগর উত্তর-দক্ষিণ) বহাল রয়েছে। যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব করা হয়েছে। এ অবস্থায় যুবদলের জন্য আন্দোলনে গতি আনতে পারবেন এমন নেতা খোঁজা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ছাত্রদল: ২০১৫ সালের ১৪ অক্টোবর ১৫৩ সদস্যের ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির সভাপতি রাজীব আহসান, সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। কমিটি গঠনের পর বঞ্চিত ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ব্যাপক আন্দোলন শুরু করেন। বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশানের কার্যালয় ও নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন তারা। এক পর্যায়ে ৭৩৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় বিএনপি হাইকমান্ড। তবে কাউন্সিলের মাধ্যমে এ কমিটি হয়নি। গত ১ জানুয়ারি ছাত্রদলের কাউন্সিল হয়। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা থাকায় তারা আন্দোলন করতে পারছেন না বলে জানান।
শ্রমিক দল: ২০১৪ সালের ১৯ ও ২০ এপ্রিল জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিন দিন পর আনোয়ার হোসাইনকে সভাপতি, নুরুল ইসলাম খান নাসিমকে সাধারণ সম্পাদক ও জাকির হোসেনকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ৩৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়াও রয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগর কমিটি।
কৃষক দল: এক সময় বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে কৃষক দলও সম্মুখ সারিতে থাকত। তবে বর্তমানে কৃষক দল আন্দোলনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। কৃষক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সাধারণ সম্পাদক বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু মূল দল নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সংগঠনের অন্য নেতারাও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। মির্জা ফখরুল কৃষক দলের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। এ কারণেই কমিটি পুনর্গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে দলের হাইকমান্ড।
জাসাস: বিএনপির আন্দোলনে জাসাসও এক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। প্রতিটি আন্দোলন-কর্মসূচিতে জাসাসের নিজস্ব শিল্পীরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে তুলতেন। জাসাস এখন একেবারেই নীরব হয়ে গেছে। সংগঠনে গ্রুপিং চলছে। ছয় বছর আগে জাসাসের কমিটি হয়েছে। নতুনভাবে কমিটি গঠনের কার্যক্রম চলছে।
ওলামা দল: দীর্ঘদিন ধরে ওলামা দলের সভাপতি হাফেজ আবদুল মালেক ও সাধারণ সম্পাদক মাওলানা শাহ মো. নেছারুল হক। পদ-পদবি নিয়ে তেমন কোনো গ্রুপিং না থাকলেও ওলামা দলের কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই বললেই চলে।
তাঁতী দল: ২০০৮ সালের ২২ মে কমিটি গঠন হয়। এরপর আর কাউন্সিল হয়নি। বর্তমান সভাপতি হুমায়ুন ইসলাম খান পরপর দুইবার সভাপতি হন। সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ হতে চান সভাপতি। তাঁতী দল বিভিন্ন জেলায় কমিটি করেছে।
মৎস্যজীবী দল: মৎস্যজীবী দলের কমিটি ২০০৯ সালে হয়। কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে ৪ বছর আগেই। সংগঠনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মাহতাব ও সাধারণ সম্পাদক মিলন মেহেদী। কমিটির নেতাদের তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না।

 

আজকের প্রশ্ন

কিছু সহিংসতা ও অনিয়ম হলেও সামগ্রিকভাবে ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে—সিইসির এই বক্তব্যের সঙ্গে আপনি একমত?