মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ,২০১৯

Bangla Version
  
SHARE

মঙ্গলবার, ০৮ অক্টোবর, ২০১৯, ০৭:৫২:০৭

নাটকীয় ল্যান্ডস্কেপের রাজ্যে

নাটকীয় ল্যান্ডস্কেপের রাজ্যে

ঢাকা : ফেলুদা সিরিজ পড়ছিলাম। ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’ পড়ার সময় সত্যজিৎ রায়ের অপূর্ব ভাষাশৈলীতে সিকিম রাজ্যের বর্ণনা পড়ার পর থেকে মনে হচ্ছিলো নিজ চোখে দৃশ্যগুলো না দেখলে মনের শান্তি হবেনা।

খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম গত বছরেই বাংলাদেশীদের জন্য অনুমতিসাপেক্ষে সিকিম রাজ্যে ঘুরে আসা যাবে। তখন থেকেই প্ল্যানিং শুরু। আশেপাশের সবাইকে বলে অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে গ্রুপও রেডী করে ফেললাম।

সিকিম ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য। এর তিনদিকে নেপাল, চীন আর ভূটানের বর্ডার। সিকিমকে বলা হয় নাটকীয় ল্যান্ডস্কেপের রাজ্য। কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে নর্থ সিকিম যেমন বরফে ঢাকা থাকে, আবার সাউথ সিকিমে সবুজের সমারোহ। এখানে নেপালী, ভুটানের কালচারাল প্রভাব অনেক বেশি। অনেক পুরোনো বুদ্ধিস্ট মনেস্ট্রি, মন্দির সিকিমকে ঐতিহাসিক জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, আবার অসাধারণ সব দৃশ্য- পাহাড়, নদী, মেঘের মিলনমেলা এই সিকিম।

অতঃপর, গ্যাংটকে গণ্ডগোল করার চিন্তা না করে অনেক আনন্দ করার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৩ই সেপ্টেম্বর বেরিয়ে পড়লাম। শুরুতেই ১১ ঘন্টার ট্রেন জার্নি করে বাসে বর্ডারে যেয়ে বর্ডার ক্রস করে মানি এক্সচেঞ্জ সেরে শিলিগুড়ি এসএনটি। ওখানে সিকিমের পারমিশন নিয়ে খাওয়া সেরে জীপ ভাড়া করলাম। একটু দেরি হয়ে যাওয়ায় শেয়ারে না নিয়ে রিজার্ভ করে নিলাম। ওখান থেকেই এডভেঞ্চারের শুরু। তিস্তা নদীর পাশ দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে যখন সিকিম রাজ্যে ঢুকলাম, তখন রাস্তাও খাড়া হতে শুরু করলো। অবশেষে শিলিগুড়ি থেকে ১২০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ৫৪০০ ফুট উচ্চতায় গ্যাংটক শহরে প্রবেশ করলাম।

হোটেল ঠিক করে পিছনের জানালা খুলতেই চোখ ছানাবড়া! মনে হচ্ছিলো আকাশের তারাগুলো সব মাটিতে নেমে এসেছে। ওপাশের পাহাড়ের ঘরবাড়ি থেকে ইলেকট্রিক লাইটের আলো এপাশ থেকে তারার মেলার মতোই মনে হচ্ছিলো। ততক্ষণে বেশ শীত লাগাও শুরু হয়ে গিয়েছিলো। পরদিন সকালে উঠে দেখি বাইরে হালকা বৃষ্টি। আর রুমে মেঘ চলে আসছে। কম্বলের নিচ থেকে বেরিয়ে পুরি সবজির নাস্তা সেরে চলে গেলাম পরদিন নর্থ সিকমের প্যাকেজ নিতে। এরপর চলে গেলাম বিখ্যাত রোপওয়ে বা ক্যাবল কারে চড়তে। ১০ মিনিটের ছোট জার্নি হলেও এই অল্প সময়েই উপর থেকে পুরো শহর, আশেপাশের পাহাড়গুলো আর তার গায়ে ছোট ছোট ঘরবাড়ি দেখলাম।

দেখে অবাক লাগলো এতো উঁচু পাহাড়ের গায়ে এতো বাড়ি বানালো কিভাবে! আবার অনেক জায়গায় ধাপে ধাপে সমতল করে চাষের জমিও করা হয়েছে। তারপর গাড়ি ঠিক করে চলে গেলাম রুমটেক মনেস্ট্রি। পাহাড় থেকে অনেকটা নেমে আবার পাহাড়ে উঠা। হরেক রঙের এতো কম্বিনেশন আগে কখনো দেখিনি। অপূর্ব সুন্দর এই মনেস্ট্রি। অসাধারন ডিজাইনের সব কারুকার্য দেখে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করে। আর ভিতরে ঢুকলেই একটা পবিত্র ভাব চলে আসে। একদিকে কবুতর খাচ্ছে, আরেকদিকে কিছু বাচ্চা খেলছে। আর আমরা লেগে গেলাম একটা কলামের উপর কয়েন তোলার প্রতিযোগিতায়। আর মেঘ তো যেনো খেলছিলো। এই রোদ তো এই মেঘে ঢাকা তো এই বৃষ্টি। সব মিলিয়ে নতুন সব অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলাম গ্যাংটক শহরে।

সন্ধ্যায় শহরেই ঘুরাঘুরি আর প্রচুর খাওয়া-দাওয়া করলাম। এতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শহর আর দেখিনি। কোথাও এক টুকরো কাগজ বা পলিথিন পড়ে থাকতে দেখিনি। গ্যাংটক শহরে পাবলিক প্লেসে ধূমপান একদম নিষিদ্ধ। কেউ পাবলিক প্লেসে ধূমপান বা ময়লা ফেলতে ধরা পড়লে বেশ বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। আর সবাই খুব সন্দরভাবেই আইন মেনে চলে। এমনকি পুরো সময়টায় গাড়ির হর্ণ কয়বার শুনেছি গুনে বলে দেয়া যাবে। আর ওখানের মানুষগুলোও খুবই সৎ আর হেল্পফুল। যাই হোক, পরদিন নর্থ সিকিমের লম্বা জার্নি ছিলো, তাই আগে আগেই শুয়ে গেলাম। সকালে উঠে ট্যাক্সি করে জীপ স্ট্যান্ড, ওখান থেকে জীপে চেপে বসলাম নর্থ সিকিমের উদ্দেশ্যে। যতই উত্তর দিকে যেতে থাকলাম, দৃশ্যগুলো ক্রমেই চেঞ্জ হতে থাকলো। শুরুতে হালকা বৃষ্টি ছিলো, এরপর শুকনো, পরে আবার বৃষ্টি।

পথে প্রথমে সেভেন সিস্টার্স ফল দেখলাম। আহামরি সুন্দর মনে হয়নি। এরপর দুপুরের খাবার খেয়ে আরো দুটো ফলস আর ভিউ পয়েন্ট দেখে একদম সন্ধ্যায় ৮৯০০ ফুট উচ্চতায় লাচুং যেয়ে পৌঁছালাম। তখন খুব ভালোভাবেই শীত লাগা শুরু হয়েছিলো। মনে হলো টেম্পারেচার ১০-১২ এর বেশি হবে না। তার উপর আছে বৃষ্টি। ওখানে হোটেলে জিনিসপত্র রেখে গরম গরম চা খেয়ে নিলাম। হোটেল চালান বিএসএফ এর প্রাক্তন সোলজার। খুবই ফ্রেন্ডলি আর মজার মানুষ ছিলেন উনি। মুহূর্তেই আমাদের সাথে ফ্রি হয়ে গেলেন। বাংলাদেশীদের অনেক প্রশংসাও করলেন। আর খাবারও ছিলো সুস্বাদু। যাই হোক, ঠান্ডার জন্য রাতে দ্রুতই ঘুমিয়ে গেলাম।

পরদিন ভোর ৫.৩০ এ উঠেই সবাই রেড়ি হয়ে গেলাম। আমাদের ড্রাইভার ৫.৩০ এ উঠতে বললেও ভাবেননি যে সত্যি সত্যিই আমরা এতো দ্রুত উঠে যাবো। রাতে আশেপাশের দৃশ্য দেখা হয়নি। সকালে দেখি হোটেলের ঠিক পিছনেই বিশাল পাথরের পাহাড় আর তার মাঝখান দিয়েই ঝর্ণার পানি পড়ছে। আর সামনেই খরস্রোতা এক পাহাড় নদী। এই নদী পরে তিস্তার সাথে যেয়ে মিশে গেছে। নাস্তা করে ইয়ামথাং ভ্যালির জন্য রওনা দিলাম। নর্থ সিকিম শীতকালে যেরকম থাকে, বর্ষায় ঠিক অন্যরকম দৃশ্য। ছবিতে সব সাদা বরফ দেখলেও বর্ষার সিন ছিলো পুরোই অন্যরকম। সারাক্ষনই মেঘ আর সবুজ পাহাড়ের লুকোচুরি। আর মাঝে মাঝেই বড় বড় সব ঝর্না চোখে পড়ছিলো। অসম্ভব আঁকাবাঁকা আর খাড়া রাস্তা পেরিয়ে আমরা সরাসরি চলে গেলাম ১৫৭৪৮ ফুট উচ্চতার জিরো পয়েন্টে।

গাড়ি থেকে নেমেই দাঁতে দাঁতে বাড়ি লেগে ঠকঠক শব্দ করতে লাগলো। গায়ে তিনটা গেঞ্জি আর শার্টের উপর ভারী জ্যাকেট চাপিয়েও হাঁটুর কাঁপুনি থামানো যাচ্ছিলো না। তাপমাত্রা বড়জোর ১-২ ডিগ্রী হবে। হালকা বৃষ্টির কারনে পানি দ্রুত শরীরের তাপ শুষে নিচ্ছিলো। সামনেই দোকানে আগুনে হাত পা একটু গরম করে কয়েকটা ছবি তোলার পর হাত যখন অসাড় হয়ে যাচ্ছিলো, ছবি ক্লিক করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তখন আবার কিছুক্ষন হাত গরম করে আবার কিছুক্ষন ছবি তোলা। আর গরম গরম ম্যাগী নুডলস খেয়ে কিছুটা সাহায্য হয়েছিলো। বেশিক্ষন না থেকে ফেরার পথ ধরে চলে গেলাম ১১৭০০ ফুট উচ্চতার ইয়ামথাং ভ্যালী। দুই পাশে পাহাড় আর মাঝ দিয়ে একটু সমতল আর পাশেই পাহাড়ী নদী। প্রাণ জুড়ানো দৃশ্য দেখে আর ঠান্ডার কাঁপতে কাঁপতে ছবি তুলে ফিরতি পথ ধরলাম। হোটেলে লাঞ্চ করে এবারে গ্যাংটকে যাত্রা। ড্রাইভার বাইচুং দাদা খুব ভয়ে ছিলেন ল্যান্ডস্লাইড নিয়ে। কারন যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছিলো, তার উপর ওরকম ইয়ং মাউন্টেইনস ঘন ঘন ভুমিকম্প হয়, তাই ভূমিধস সেই সময়ে একদম স্বাভাবিক বিষয়। আর সেটা হলে কয়েকদিনের জন্য আটকা পড়তে হতো।

যাই হোক, ছোট খাটো ২-৩ টা ভূমিধস দেখলেও কোনোটাই রাস্তা বন্ধ করার মতো বড় ছিলো না। তাই নিরাপদেই পৌঁছে গেলাম গ্যাংটক। পথে চেকপোস্ট থেকে এক আইপিএস অফিসার রাজ আমাদের সঙ্গী হিসেবে যোগ দিলেন গ্যাংটক যাওয়ার জন্য। পুরো পথ উনার সাথে গল্প গুজবেই কেটে গেলো। সাইফুলের ডোরেমন থেকে শিখা হিন্দি দিয়েই অনেক লম্বা আলাপ হলো। গ্যাংটক পৌঁছে পরেরবার এসে উনার আতিথেয়তায় বেড়িয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিদায় নিলেন। গ্যাংটকে শেষ রাতটায় ডমিনোসের পিজ্জা খেয়ে কিছুটা নষ্টও করে লম্বা ঘুম দিলাম।

আজকের প্রশ্ন

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?