রবিবার, ০১ আগস্ট ,২০২১

Bangla Version
  
SHARE

মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই, ২০২১, ১২:৫৯:৪০

মেসির জন্য অভিনন্দন ও ভালোবাসা

মেসির জন্য অভিনন্দন ও ভালোবাসা

সৈয়দ আবদাল আহমদ
দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক কোনো শিরোপা জয়ের স্বপ্নটা পূরণ হওয়ায় আনন্দ বন্যায় ভাসছিলেন লিওলেন মেসি। ব্রাজিলের বিখ্যাত ফুটবল ভেন্যু মারকানা থেকে টিভিপর্দায় দেখা যায় সতীর্থরা তাদের অধিনায়ক মেসিকে কোলে তুলে নিয়ে শূন্যে ছুড়ে দিলেন। আর মেসি হাওয়ায় উড়লেন, ওড়ারইতো কথা! এই অনিন্দ সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করেছেন বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক।
সতীর্থরা মেসিকে শূন্যে ভাসিয়েই তাদের আনন্দে ইতি ঘটাননি। মাঠজুড়ে নেচে গেয়ে উল্লাসে মেতে ছিলেন। এক কোনা থেকে অন্য কোনায় দৌড়াদৌড়ি করেছেন। কাপে চুমু খেয়েছেন। সমর্থকদের কাছে নিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন। আর মেসিকে প্রশংসা-বৃষ্টিতে স্নাত করেছেন।

মেসির কাছে সাংবাদিকরা জানতে চাইলেন পরের স্বপ্নটা কী? মেসি শুধু হাসলেন। নিশ্চয়ই বুঝাতে চেয়েছেন, ‘আমার চোখ এখন কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এর দিকে’।
বিশ্বের অনন্য ফুটবলার মেসি। ব্যক্তিগত অর্জনের তার কোনো কিছুর আর বাকি নেই। এককভাবে যা জেতার সবই জিতেছেন তিনি। শুধু একটা আক্ষেপ ছিল আর্জেন্টাইন জার্সি গায়ে জড়িয়ে কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা জিততে পারেননি। সেই দুঃখ ঘুচেছে তার।

রোববার কোপা আমেরিকা ফাইনালে নেইমারের ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে মেসির আর্জেন্টিনা। এটিই মেসির প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়। অবশ্য মেসির দুঃখটা ঘুচিয়ে দিয়েছেন সতীর্থ অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। ফাইনালে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলার ২১ মিনিটের সময় একমাত্র গোলটি তিনিই করেন। এ গোল ব্রাজিল আর শোধ করতে পারেনি। ফাইনালে মেসি আলো ছড়াতে কিংবা বাঁ পায়ের চমক দেখাতে পারেননি বটে, তবে দলকে এ পর্যায়ে তুলে আনতে মূল অবদানটা ছিল তারই। কোপা আমেরিকা সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স এবার মেসিরই। পুরো টুর্নামেন্টে ফাইনালের আগে নিজে চারটি গোল করেছেন এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরো পাঁচটি গোল। এজন্য টুর্নামেন্ট সেরা হিসেবে মেসিকেই দেয়া হয়েছে গোল্ডেন বুট এবং বল। অর্থাৎ কোপা আমেরিকা ট্রফি টুর্নামেন্ট সেরা এবং সেরা গোলদাতার পুরস্কার- পুরো কোপা আমেরিকাই এবার নিজের করে নিয়েছেন মেসি। ফাইনালে ম্যাচসেরা হয়েছেন ডি মারিয়া, যিনি মারকানা স্টেডিয়ামের খেলায় মেসির জন্য আশীর্বাদ হয়ে নেমেছিলেন। মারিয়ার গোলটি ছিল চোখধাঁধানো। খেলার ২১ মিনিটের সময় মাঝ মাঠ থেকে রদ্রিগোর পাস করে দেয়া বলটি ধরে দারুণ চিপে জালে জড়িয়ে দেন তিনি। এরপর মেসির সঙ্গে উল্লাসে মেতে ওঠেন! নেইমারেরা সেই গোল শোধ করতে মাঠে কী মরিয়াই না ছিলেন। কিন্তু মেসির দল এতই সতর্ক থেকেছে যে, সেই সুযোগ তারা পাননি। ১৯৯৩ সালে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তার গোলে শেষ কোপা আমেরিকা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। এর ২৮ বছর পর আবার শিরোপা জিতল। এটা আর্জেন্টিনার ১৫তম কোপা আমেরিকা শিরোপা জয়।

মেসির ফুটবল ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, সম্ভব অসম্ভব প্রায় সব সাফল্যই তিনি পেয়েছেন। শুধু বাকি ছিল আন্তর্জাতিক কোনো বড় শিরোপা পাওয়া। ২০০৫ সালে ফিফা ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতাতে মেসি সাহায্য করলেও সেটা গোনায় ধরা হয় না। ফলে বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা হিসাবে এবার কোপা আমেরিকা জয় মেসির ফুটবল রেকর্ডে অনন্য সংযোজন। এর সঙ্গে রয়েছে টানা চারবারসহ ছয়বার ব্যালন ডি অ’র জয়ের কৃতিত্ব। যা ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর পাশাপাশি তিনি সর্বোচ্চ ছয়বার ইউরোপীয় গোল্ডেন বুট জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। তার পেশাদার ফুটবল জীবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে বার্সেলোনায়। সেখানে তিনি লা লিগা, কোপাদেল রেসহ বার্সেলোনার হয়ে মোট ৩৫টি শিরোপা জয় করেছেন, ১২ বার্সোলোনার ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ। এ ছাড়াও সাত শতাধিক গোলের মালিক মেসি। তিনি একজন অসাধারণ গোলদাতা হিসেবে পরিচিত। তার দখলে রয়েছে স্পেনিশ লিগ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা ৪৭৪টি। এক ক্লাবের (বার্সোলোনা) সর্বোচ্চ গোলদাতা ৬৪৩টি। আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ গোল ৭৫টি। লা লিগা ও ইউরোপের যেকোনো লিগে মৌসুমের সর্বোচ্চ ৫০ গোল, ইউরোপে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ৭৩ গোল এবং লালিগা (৩৪) ও চ্যাম্পিয়নস লিগে (৮) সর্বোচ্চ হ্যাটট্রিকের কৃতিত্ব।

মেসি যে একজন সৃষ্টিশীল প্লেমেকার হিসেবে পরিচিত সে কথা পেলে এবং ম্যারাডোনা দু’জনই বলেছেন। পেলে বলেন, ‘আমি মেসিকে পছন্দ করি, কারণ সে অসাধারণ খেলোয়াড়।’ আর ম্যারাডোনার উক্তি ছিল, ‘আমি সেই খেলোয়াড়কে দেখেছি যে আর্জেন্টিনায় আমার জায়গা দখল করেছে। সে হলো মেসি।’ ম্যারাডোনা আজ বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে মেসির নতুন সাফল্যে তিনিই বেশি খুশি হতেন। মেসিকে জড়িয়ে ধরে স্নেহ করতেন।

মেসির অনন্য প্রতিভা সম্পর্কে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ারের মন্তব্যও খুব সুন্দর। তিনি বলেন, ‘আমি যখন মেসিকে দেখি, তখন ম্যারাডোনার কথা মনে হয়।’ বার্সালোনার কোচ গার্দিওলা বলেন, ‘তাঁকে নিয়ে লিখো না, তাঁকে বর্ণনা করার চেষ্টা করো না। শুধু দেখে যাও।’

কোচ স্কলারির মন্তব্য আরো সুন্দর। তিনি বলেন, ‘ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জীবনে একমাত্র খারাপ জিনিস হলো মেসি। যদি মেসি না থাকত, তাহলে রোনালদোই হতো বিশ্বসেরা।’ ফুটবলার লুইস ফিগো বলেন, ‘আমার জন্য মেসির খেলা দেখা আনন্দের।’

মধ্য আর্জেন্টিনায় জন্ম (২৪ জুন, ১৯৮৭) ও বেড়ে ওঠা মেসি ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোন সংক্রান্ত জটিলতায় আক্রান্ত হন। আর্জেন্টিনায় কোনো ক্লাবের পক্ষে তার চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব ছিল না। বার্সেলোনা তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। মেসি ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে স্পেনে চলে যান। এবারই চুক্তি শেষে মেসি হন একজন ফ্রি এজেন্ট। ২০১৪ সালে তিনি বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তার চোখ এখন সম্ভবত থাকবে কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এর দিকে। ইতোমধ্যে তিনি আর্জেন্টিনা দলে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের খেলায় অংশ নিয়েছেন। কাতারে বিশ্বকাপ যখন শুরু হবে, তখন তার বয়স হবে ৩৫। কোপা আমেরিকা শিরোপা জয়ে মেসির সাথে ভক্তরাও আনন্দিত। তারা এখন কাতার বিশ্বকাপের জন্য মেসিকে সাহস জুগিয়ে যাবেন। কারণ মেসি তো সবার ভালোবাসার ধন!

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা খেলা, তাই এত আলোড়ন!
বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশ সব সময়ই ছিল মাতোয়ারা। কোপা আমেরিকা বা ইউরোপিয়ান ফুটবল নিয়ে তেমন হইচই আগে খুব একটা দেখা যায়নি। কিন্তু এবারই ব্যতিক্রম। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের সর্বোচ্চ শিরোপা কোপা আমেরিকা ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশেও বেশ কৌতূহল। এটার কারণ হয়তো করোনা মহামারীই হবে। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে মানুষ অনেকটা ঘরবন্দী। বিনোদনের তেমন সুযোগ নেই। এর মধ্যে এসেছে এই ফুটবল টুর্নামেন্ট। ফলে ঘরে বসে টিভিতে খেলা উপভোগ করছে মানুষ। এর মধ্যে আবার ফাইনালে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা! মেসি-নেইমার। ফলে আনন্দের মাত্রা বেড়ে গেছে। কারণ বাংলাদেশে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা দু’দলের খেলাই জনপ্রিয়। দু’দলেরই দর্শক আছে। তেমনি মেসির ভক্ত যেমন আছেন, নেইমারের ভক্তও কম নন। ফলে গণমাধ্যমে কোপা আমেরিকা ফুটবল এত গুরুত্ব পেয়েছে।

ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ২০০৭ সালে শেষবার কোপা আমেরিকার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল। সেবার ব্রাজিল ৩-০ গোলে জয় পায়। ২০১৯ সালেও এ দু’দল মুখোমুখি হয় ফাইনালে। ব্রাজিল আর্জেন্টিনাকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল।
অবশ্য দু’টি বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা এবং পাঁচটি বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলের মধ্যে আর্জেন্টিনা কোপা আমেরিকা শিরোপাজয়ী বেশি সংখ্যায়। এবারের শিরোপা জয় নিয়ে আর্জেন্টিনা ১৫ বার কোপা আমেরিকা কাপ জয় করল। ব্রাজিল জিতেছে ৯ বার। তবে টুর্নামেন্ট বা প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ১০৭ বার মুখোমুখি হয়েছে এই দুই দল। এর মধ্যে ব্রাজিল ৪৮ বার জয় পেয়েছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা জয় পেয়েছে ৩৪টি ম্যাচে। বাকি ২৫টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে হইচইয়ের এটাও একটা কারণ। তাছাড়া মেসি এবং নেইমার বার্সেলোনায় একসাথে খেলেছেন। এবার নেইমার চাচ্ছিলেন কোপা আমেরিকা ফাইনালে যেন আর্জেন্টিনা উঠে আসে। নেইমারের আশা পূরণ হয়েছে। কলম্বিয়াকে হারিয়ে মেসিরা ফাইনালে এসেছেন। ফলে এত আলোড়ন!

ঢাকায় এসেছিলেন মেসি
বিশ্ব ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এসেছিলেন। সেদিন তাকে নিয়ে দেখা গিয়েছিল অজস্র কৌতূহল, উচ্ছ্বাস আর আবেগ। নানা উপমায় ঢাকার কাগজগুলোতে শিরোনাম হয়েছিলেন মেসি। ঢাকার মাটিতে জাদুর পা, মাটিতে নেমে আসে আকাশের তারা, মেসিময় ঢাকা, পৃথিবীর এ সময়কার শ্রেষ্ঠতম ফুটবলার আরো কত কী!
মেসিকে নিয়ে উন্মাদনা তো হওয়ারই কথা। যে শহরে এর আগে এশীয় মানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবল দলের পা পড়েনি, সেখানে যখন আর্জেন্টিনা দল এবং বিশ্বসেরা ফুটবলার মেসি চোখের সামনে, তখন আবেগ-উন্মাদনার মাত্রা বেশিই তো হবে! বিশ্বকাপ মওসুম এলে আর্জেন্টিনার পতাকায় ছেয়ে যায় দেশ। এই তো কোপা আমেরিকা ফাইনাল খেলায় মেসির পক্ষ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দু’দিন আগে দু’গ্রুপে মারামারি হয়ে যায়। ফলে রোববার ফাইনালের দিনে পুরো জেলায় পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছিল। তাই বলছিলাম ঢাকায় যখন মেসি পা রাখলেন, তখন নগরীর ফুটবলপ্রেমীরা আনন্দে ভাসছিলেন। মেসি সেদিন ক্রীড়ানুরাগী ও তরুণদের চমকে দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ হলো আর্জেন্টিনা ফুটবলের এক অন্যতম ভক্তের দেশ। এর মূলে ম্যারাডোনা-দিয়েগো ম্যারাডোনার ফুটবল জাদুর সম্মোহন। মেসি তারই উত্তরসূরি। তাছাড়া বিশ্ব ফুটবলের বর্তমান রাজকুমার লিওনেল মেসি। পেলে এবং ম্যারাডোনার সঙ্গে যে নামটি উচ্চারণ করা হয়, সেটি আর কেউ নন, মেসি। এ কারণে ঢাকায় মেসিকে পেয়ে ফুটবলপ্রেমীরা বাঁধভাঙা আনন্দে মেতেছিলেন। শরীরে মেসি, মুখের আলপনায় মেসি এবং হৃদয়ে মেসিকে ধারণ করে হাজার হাজার ভক্ত ঢাকা স্টেডিয়ামে, হোটেলের সামনে এবং বিমানবন্দরে ভিড় করেছিলেন। গায়ে আর্জেন্টাইন জার্সি, মাথায় আর্জেন্টাইন পতাকায় টুপি করে ‘মেসি, মেসি’ চিৎকার গলা ফাটিয়েছিলেন। নাইজেরিয়ার সঙ্গে প্রীতিম্যাচের খেলাটি মেসি পুরো ৯০ মিনিটই খেলে দর্শকদের তৃপ্তি দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি ঢাকার দর্শকদের চোখে আবার ভেসে উঠেছিল।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব

 

আজকের প্রশ্ন

পুরো ঢাকায় ‘অঘোষিত কারফিউ’ চলছে। সরকার জনগণকে জিম্মি করে জনগণকে বাদ দিয়ে বিদেশি অতিথিদের নিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে ব্যস্ত। ফখরুলের এক মন্তব্যের সঙ্গে আপনি কি একমত?