রবিবার, ১৭ জানুয়ারী ,২০২১

Bangla Version
  
SHARE

শুক্রবার, ০১ জানুয়ারী, ২০২১, ১২:৫৪:১৫

পরিবেশ উপেক্ষা করে উন্নয়ন নয়

পরিবেশ উপেক্ষা করে উন্নয়ন নয়

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
নতুন আরেকটি বছরের শুরু হচ্ছে আজ। অন্যান্য বছরের তুলনায় বছরটি শুরু হলো ভিন্ন অভিজ্ঞতায়। পরিবেশের ক্ষেত্রে সফলতা-ব্যর্থতা দুই দিকই ছিল অন্য বছরগুলোতে। কিন্তু নতুন বছরে সফলতা-ব্যর্থতার সঙ্গে করোনার চ্যালেঞ্জও যুক্ত হয়েছে। করোনা বাস্তবতায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, পরিবেশ উপেক্ষা করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না। আমাদের মনে রাখা দরকার, প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকা যায় না। বরং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে থাকতে হয়। এই করোনার মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তার দিকটিও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম দু-তিন মাস ধান কাটা, শস্য রোপণের বিষয়ে সরকার খুব চিন্তিত ছিল। নতুন বছরে আমাদের এ ব্যাপারে আরও ভাবতে হবে। আমার মনে হয়, সরকার যে ধারায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, নতুন বছরে সে ব্যাপারে পুনর্বিবেচনা করা দরকার। কেননা অনেক উন্নয়ন প্রক্রিয়াই প্রকৃতি বিধ্বংসী হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে আমরা কয়েক দফায় দেখেছি, ঢাকার বাতাস বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাস হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের দেশ অর্থনৈতিকভাবে যত উন্নত হোক না কেন, নাগরিকরা যদি মুক্ত ও বিশুদ্ধ বায়ু সেবন করতে না পারে এবং এ কারণে যদি তারা মারাত্মক সব অসুখে আক্রান্ত হয়, তাহলে সেটা প্রকৃতি উন্নয়ন হতে পারে না। বস্তুত পরিবেশ বিবেচনায় না রেখে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলতে পারে না। মুক্ত বা বিশুদ্ধ বায়ু মানুষের জীবনের অধিকার। এই অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড না হবে টেকসই, না হবে গ্রহণযোগ্য। কাজেই নতুন বছরে সরকারকে আরও বেশি পুনর্বিবেচনা করতে হবে যে, উন্নয়ন ধারা কীভাবে পরিবেশবান্ধব করে তোলা যায়।
আমাদের দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে উচ্ছ্বাস বেশ। কিন্তু এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সাম্যের দিকটি যেমন ভুলে যাওয়া হয়, তেমনই পরিবেশ দূষণের কারণে জিডিপির লোকসানের দিকটিও আলোচিত হয় না। অথচ অর্থনৈতিক সাম্য পরিবেশগত ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষকের জমি দখল করে যে উন্নয়ন হয়, সেটাকে সাম্যভিত্তিক উন্নয়ন বলা যায় না। কারণ যাদের জমি দখল করা হয় বা অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়, তারা এক পর্যায়ে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। এখানেই অধিকার ও সাম্যের প্রশ্ন। যে উন্নয়ন সাম্যভিত্তিক নয়, সেটা পরিবেশবান্ধবও নয়। জিডিপি নিয়ে উচ্ছ্বাসের বদলে আমাদের বরং ভুটানের মতো 'গ্রস হ্যাপিনেস ইনডেক্স' চর্চা করা উচিত।
আমি দেখতে চাই, নতুন বছরে সরকার 'লো কার্বন ডেভেলপমেন্ট' নীতি গ্রহণ করেছে। কয়লা বা গ্যাস পুড়িয়ে যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, তা কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ বহুমুখী করে তুলবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কথাও নতুন বছরে গভীরভাবে ভাবতে হবে। অবাস্তবায়নযোগ্য কোনো সমাধানের পথে যাওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যেসব দেশ গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ করছে, তারা যেন নিঃসরণ কমায়, সে ব্যাপারে জোর দাবি তুলতে হবে। যদি তারা নিঃসরণ না কমায়, তাহলে আমরা যত সতর্কই হই না কেন, একসময় ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
বিদায়ী বছরে নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে সরকারের সফলতা আমরা দেখেছি। তবে এই উদ্যোগ ঢাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন বছরে প্রতি জেলায় ছড়িয়ে দিতে হবে। নতুন বছরের প্রত্যাশা থাকবে, সরকার অন্তত প্রতি জেলায় একটি করে নদী উদ্ধার করবে। পরিবেশ অধিদপ্তরকেও সব জেলায় ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনীয় উপধারা ও জনবল দিয়ে ক্ষমতায়িত করতে হবে। যাতে করে তারা প্রতিটি জেলার পরিবেশ সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারে।

সরকার অনেক বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে, যার সঙ্গে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকে না। আমি দেখতে চাইব, নতুন বছরে অবশ্যই জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামত নিশ্চিত করে উন্নয়ন প্রকল্প গৃহীত হচ্ছে।
প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি

আজকের প্রশ্ন

বিএনপির নেতারা আইন না বুঝেই মন্তব্য করে আইনমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে আপনি কি একমত?